যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির (এআরটি) প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের আমদানি খাতে। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্য সামনে রেখে চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি এক বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ১০৪ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৯ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে প্রায় ১০১ শতাংশ। অন্যদিকে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে অনেক ধীর। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৪৬২ কোটি টাকায়।
এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, মোট আমদানির প্রায় ৩৮ শতাংশই করেছে তিনটি সরকারি প্রতিষ্ঠান—পেট্রোবাংলা, খাদ্য অধিদপ্তর এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই বড় সরকারি আমদানিগুলোই সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে দ্রুত গতিতে বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের (ইউএসটিআর) সঙ্গে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ বা এআরটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয় ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে। সেই আলোচনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে। তবে শুরু থেকেই এটি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে এমন চুক্তি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তার মতে, চুক্তিটির ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন এখন অনিশ্চয়তার মধ্যেও রয়েছে।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পারস্পরিক শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে রায় দেয়। এরপর থেকেই এ ধরনের চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি মালয়েশিয়াও ১৬ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একই ধরনের চুক্তি বাতিল করে দেয়।
পরবর্তীতে ট্রাম্প প্রশাসন ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের অধীনে প্রথমে ১০ শতাংশ এবং পরে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। তবে ৭ মে নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালত রায় দেয়, এই আইন কেবল তখনই প্রয়োগযোগ্য, যখন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি “বড় ও গুরুতর” হয়—যা বর্তমান পরিস্থিতিতে নেই বলে আদালত উল্লেখ করে।
এআরটি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ৪ হাজার ৫০০টি মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহারে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি আরও ২ হাজার ২১০টি পণ্যের শুল্ক ধাপে ধাপে কমানো হবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ফাইবার, লোহা, ইস্পাত, ওষুধ, রাসায়নিক এবং তুলাজাত পোশাকসহ বাংলাদেশের ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যের ওপর থেকে প্রতিশোধমূলক শুল্ক তুলে নিয়েছে। তবে গড়ে ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ মোস্ট ফেভারড নেশন (এমএফএন) শুল্ক এখনো বহাল রয়েছে।
ইউএসটিআর বাংলাদেশের পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক আরও ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়েছে। এর আগে গত বছরের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিল।
আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হলেও সরকার এর মধ্যেই আমদানি কার্যক্রম শুরু করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য বোয়িংয়ের সঙ্গে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি। অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রই বেশি সুবিধা পাচ্ছে। চুক্তিতে শুধু শুল্ক কমানো নয়, কৃষিপণ্য, জ্বালানি ও শিল্প কাঁচামালের ন্যূনতম বার্ষিক আমদানির প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। ফলে দেশীয় চাহিদা না থাকলেও নির্দিষ্ট পণ্য আমদানি করতে হতে পারে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির ৮৩ শতাংশই এসেছে মাত্র ১০টি পণ্য থেকে, যার মোট মূল্য ১৫ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে রয়েছে এলএনজি, এলপিজি, সয়াবিন, গম, তুলা, লোহা ও ইস্পাত স্ক্র্যাপ, সয়াবিন অয়েলকেক, উড়োজাহাজের ইঞ্জিন এবং তরল প্রোপেন।
তালিকার শীর্ষে রয়েছে এলএনজি, যার পরিমাণ ৪ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা, এটি আমদানি করেছে পেট্রোবাংলা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এলপিজি, যার বড় অংশ এসেছে ওমেরা পেট্রোলিয়ামসহ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আগের বছর এই সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো এলএনজি বা এলপিজি আমদানি করেনি। এছাড়া ১ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকার গম আমদানি হয়েছে, যার বড় অংশই করেছে খাদ্য অধিদপ্তর। আগের বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো গম আমদানি হয়নি।
তৈরি পোশাক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন তুলার আমদানি ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮০ কোটি টাকায়। অন্যদিকে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন আমদানি নাটকীয়ভাবে বেড়ে ১৩৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
সব খাতে প্রবৃদ্ধি হয়নি। সয়াবিন তেলের আমদানি কিছুটা কমে ৩ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা থেকে ৩ হাজার ২৪০ কোটি টাকায় নেমেছে। লোহা ও ইস্পাত স্ক্র্যাপের আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা থেকে ৭০৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ও সিইও এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শুল্ককে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বাণিজ্য চুক্তি আদায়ে সক্রিয়। বাংলাদেশের মতো বড় রপ্তানিকারক দেশের ক্ষেত্রে এই চাপ বেশি কাজ করে। তার মতে, চুক্তির কারণে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েই আমদানি বেড়েছে এবং ভবিষ্যতেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আগে যেসব পণ্য অন্য দেশ থেকে আমদানি হতো, এখন সেগুলোর বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসছে। ফলে চুক্তির প্রভাব এখন বাস্তবভাবেই আমদানির কাঠামো বদলে দিচ্ছে।

