যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য ধীরগতি দেখা দিয়েছে। দেশটির ‘রিসিপ্রোকাল’ শুল্কনীতি, ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়া, উচ্চ সুদের হার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এই পতন আরও তীব্র হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানিতে স্পষ্টভাবে এই চাপের প্রভাব দেখা গেছে।
মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের দপ্তর (অটেক্সা)-এর তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি দাঁড়িয়েছে ৫৯৯ কোটি ডলারে। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭.৮০ শতাংশ কম। আর জানুয়ারি–মার্চ সময়ে দেশটির মোট আমদানি নেমে এসেছে ১ হাজার ৭৭৩ কোটি ডলারে, যা গত বছরের তুলনায় ১১.৬৩ শতাংশ কম।
বাংলাদেশের রপ্তানিতেও পতন:
অটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৬৬ কোটি ৪৯ লাখ ডলার। এটি আগের বছরের মার্চের তুলনায় ৮.০৮ শতাংশ কম। একইভাবে জানুয়ারি–মার্চ সময়ে রপ্তানি কমেছে ৮.৩৮ শতাংশ। এ সময়ে মোট আয় দাঁড়িয়েছে ২০৪ কোটি ডলারে। এর পাশাপাশি সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, বাংলাদেশি পণ্যের ইউনিট মূল্যও কমছে।
- মার্চ ২০২৬-এ গড় ইউনিট মূল্য: প্রতি পিস ২.৮৬ ডলার
- আগের বছরের তুলনায় কমেছে: ২.৭৭ শতাংশ
- জানুয়ারি–মার্চ সময়ে কমেছে: ২.৫৬ শতাংশ
রপ্তানি ভলিউমও কমেছে। মার্চে ২৩ কোটি ২৭ মিলিয়ন পিস পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫.৪৬ শতাংশ কম। প্রথম প্রান্তিকে মোট ভলিউম কমেছে ৫.৯৭ শতাংশ।
প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে বাংলাদেশ: প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনাম তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে।
- ভিয়েতনামের মার্চে রপ্তানি বেড়েছে ২.৫২ শতাংশ
- জানুয়ারি–মার্চ সময়ে বেড়েছে ২.৭৭ শতাংশ
কম্বোডিয়া আরও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে।
- মার্চে বেড়েছে ১৬.২২ শতাংশ
- প্রথম প্রান্তিকে বেড়েছে ১৭.৬০ শতাংশ
অন্যদিকে চীন ও ভারত বড় পতনের মুখে পড়েছে।
- চীনের মার্চে রপ্তানি কমেছে ৩৭.২৪ শতাংশ
- জানুয়ারি–মার্চ সময়ে কমেছে ৫২.৯১ শতাংশ
- ভারতের রপ্তানি কমেছে ২৭ শতাংশের বেশি
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা রপ্তানি খাতে বড় চাপ তৈরি করছে।
তিনি বলেন, “বৈশ্বিক বাণিজ্যে এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। মার্কিন পাল্টা শুল্ক, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানিসংকট এবং দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে রপ্তানি খাতের ওপর চাপ বাড়ছে।” তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রে চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক ক্রেতা অর্ডার ছোট করছে এবং দামের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে পোশাক রপ্তানিতে ৩১.২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি স্বাভাবিক পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে রপ্তানি ছিল ২৩৯ কোটি ডলার। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি নেমে আসে ৪৯ কোটি ডলারে, যা ছিল তুলনামূলকভাবে নিম্নস্তর। ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদুল ফিতরের ছুটি, উৎপাদন ও শিপমেন্ট ধীরগতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক অর্ডার স্থগিত হয়েছিল। ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্তও প্রভাব ফেলেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ নীতি নিয়েও এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। আদালতের সাম্প্রতিক রায়ে কিছু পক্ষের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ শুল্ক স্থগিত করা হলেও অধিকাংশ আমদানিকারকের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর রয়েছে। ফলে রপ্তানিকারকরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও মূল্য নির্ধারণে সতর্ক অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি ও কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমান বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক খাতকে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।” তিনি বলেন, উৎপাদন দক্ষতা, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশ বাড়ানো ছাড়া টিকে থাকা কঠিন হবে।
অন্যদিকে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, চীনের বাজার সংকোচনের কারণে বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়া, উচ্চ সুদের হার এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের জটিলতা পুরো পোশাক বাণিজ্যকে চাপের মুখে ফেলেছে। এ ছাড়া ট্যারিফ নীতি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
সামনে কী করণীয়: খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু রপ্তানির পরিমাণ নয়, এখন গুরুত্ব দিতে হবে—
- ইউনিট মূল্য বাড়ানো
- উচ্চমূল্যের ফ্যাশন ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইলে প্রবেশ
- উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি
- নতুন বাজার অনুসন্ধান
- বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার
বিজিএমইএ সভাপতি আরও বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত চালু করা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রবৃদ্ধির গতি থমকে গেছে। প্রতিযোগীরা এগিয়ে যাচ্ছে, আর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে চ্যালেঞ্জের মুখে। প্রশ্ন হলো—এই চাপ কি শুধু সাময়িক, নাকি দীর্ঘমেয়াদে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে?

