যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চীনের রপ্তানি কমে যাওয়ার ফলে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে বাংলাদেশ প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। বরং সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো দ্রুত অবস্থান শক্ত করছে।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক আমদানি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগের বছরের তুলনায় এই হ্রাস প্রায় ১২ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকেও রপ্তানি কমেছে প্রায় ৮ শতাংশের বেশি। এতে বোঝা যাচ্ছে, শুধু বাংলাদেশ নয়, শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলোর বেশিরভাগই চাহিদা হ্রাসের চাপের মুখে রয়েছে।
বিশেষ করে চীন ও ভারতের রপ্তানি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুল্ক বৃদ্ধি ও বাণিজ্য নীতির কঠোরতার কারণে চীনের রপ্তানি অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। ভারতের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। তবে এই দুই দেশের বাজার হারালেও তার সুবিধা সমানভাবে নিতে পারেনি বাংলাদেশ।
অন্যদিকে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া এই পরিবর্তিত বাজার পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েছে। তারা তুলনামূলকভাবে রপ্তানি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে নতুন ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে, যেখানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ দ্রুত প্রভাব বিস্তার করছে।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের শক্তিশালী কাঁচামাল ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত উৎপাদন কাঠামো অন্য দেশগুলোকে সুবিধা দিচ্ছে। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার অনেক উৎপাদন ব্যবস্থাই চীনা বিনিয়োগ ও কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। ফলে চীন থেকে সরাসরি রপ্তানি কমলেও তার প্রভাব এই দেশগুলোর মাধ্যমে আংশিকভাবে বজায় থাকছে।
বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ আরও জটিল। তুলনামূলকভাবে শ্রমনির্ভর উৎপাদনে শক্ত অবস্থান থাকলেও কাঁচামাল, দ্রুত অর্ডার পূরণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের দক্ষতায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে সিন্থেটিক ফাইবার বা আধুনিক টেক্সটাইল পণ্যের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকায় নতুন অর্ডার আকর্ষণ করা কঠিন হচ্ছে।
পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু শুল্ক পরিবর্তনের সুযোগ থাকলেই বাজার দখল সম্ভব নয়। উৎপাদন সক্ষমতা, কাঁচামাল সরবরাহ এবং দ্রুত ডেলিভারি ব্যবস্থা—এই তিনটি দিক সমানভাবে শক্তিশালী না হলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমলেও কিছু দেশ বড় বাজার ধরে রেখেছে বা সম্প্রসারণ করেছে। ভিয়েতনাম এখনো শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এলেও রপ্তানির গতি স্থিতিশীল নয়, বরং চাপের মধ্যে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্যে এখন এক ধরনের পুনর্বিন্যাস চলছে। চীনের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের ফলে উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে অন্য দেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে। কিন্তু এই স্থানান্তরের পুরো সুবিধা সবাই সমানভাবে পাচ্ছে না। যেসব দেশ আগে থেকেই শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, তারাই বেশি লাভবান হচ্ছে।
এদিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক সংক্রান্ত আইনি জটিলতা ও আপিল প্রক্রিয়া চলমান থাকায় বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি। এর প্রভাব আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রপ্তানিকারকদের আশা, বছরের মাঝামাঝি সময়ের পর বৈশ্বিক পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলে চাহিদা আবার বাড়তে পারে। তবে বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশের জন্য নতুন কৌশলগত পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়বে।

