দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মসলা আমদানিতে এবার উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরে আমদানি কমেছে প্রায় ৬২ হাজার মেট্রিক টন। এতে সরকারের রাজস্ব আয়ও কমে গেছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
কাস্টমসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমদানির এই পতনে রাজস্ব হ্রাসের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস–এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে মসলা আমদানি হয়েছিল ২ লাখ ১৫ হাজার ৫৪৫ মেট্রিক টন।
অন্যদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি নেমে এসেছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৬০ মেট্রিক টনে। এই কমার সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আয়ে। গত বছর যেখানে রাজস্ব ছিল ৫৫৫ দশমিক ৮৭ কোটি টাকা, এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫৭ দশমিক ৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ রাজস্ব কমেছে প্রায় ৯৯ কোটি টাকা।
মসলার মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে পেঁয়াজ আমদানিতে। গত বছর যেখানে আমদানি হয়েছিল ১৬ হাজার ৫১০ মেট্রিক টন, এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭৪ দশমিক ৫ মেট্রিক টনে। এতে পেঁয়াজ খাতে রাজস্ব আয় কমেছে ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ। রসুন আমদানিতেও বড় ধস নেমেছে। আগের তুলনায় প্রায় ৪৮ শতাংশ কম আমদানি হওয়ায় এই খাতের রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
কিছু খাতে চমকপ্রদ প্রবৃদ্ধি: সামগ্রিক পতনের মধ্যেও কয়েকটি মসলা খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। দারুচিনি, গোল মরিচ, আদা, হলুদ, জয়ত্রী ও জায়ফল আমদানিতে রাজস্ব আয় বেড়েছে।
- দারুচিনি আমদানি হয়েছে ১২ হাজার ৫৩৪ টন, রাজস্ব ১৪৩ দশমিক ৩৭ কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ২ শতাংশ
- গোল মরিচ আমদানি ২ হাজার ৩২১ টন, রাজস্ব ৫৩ দশমিক ২৫ কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধি ৮২ শতাংশ
- জিরা আমদানি ২ হাজার ৭৯৩ টন, রাজস্ব ৬৪ দশমিক ৬৪ কোটি টাকা, কমেছে ২৮ দশমিক ১ শতাংশ
- এলাচ আমদানি ২ হাজার ২৩৯ টন, রাজস্ব ৫২ দশমিক ৭ কোটি টাকা, কমেছে ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ
- জয়ত্রী আমদানি ৩৪৫ টন, রাজস্ব ৭ দশমিক ১১ কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধি ১৬ শতাংশ
- জায়ফল আমদানি ৩৪৬ টন, রাজস্ব ১ দশমিক ১৭ কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধি ০ দশমিক ৯ শতাংশ
- হলুদ আমদানি ৭৫৩ টন, রাজস্ব ৬ দশমিক ৮২ কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধি ৬২ শতাংশ
- মরিচ আমদানি ৮৬ টন, রাজস্ব ০ দশমিক ৩৩ কোটি টাকা, কমেছে ২৩ দশমিক ২ শতাংশ
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে মাত্র ৭৪ দশমিক ৫ টন। এতে রাজস্ব এসেছে ০ দশমিক ০৩ কোটি টাকা। রসুন আমদানি হয়েছে ৬৯ হাজার ৫৫৯ টন। রাজস্ব আয় দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ০৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ কম।
আদা আমদানি হয়েছে ৬২ হাজার ৩৯৪ টন। এই খাতে রাজস্ব আয় হয়েছে ৩৩ দশমিক ৮২ কোটি টাকা। আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ।
গত ৪ এপ্রিল ভারত থেকে ২৭ টন জিরার একটি চালান আমদানি করে খাতুনগঞ্জের বাদশা মার্কেটের বিএল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল। এই চালানে এলসি খোলা হয় ৬৪ হাজার ৩১০ ডলারের, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৪ লাখ ১২ হাজার টাকা। শুল্কসহ মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর ফলে প্রতি কেজি জিরার খরচ দাঁড়ায় ৫৮০ টাকা পর্যন্ত। অথচ বাজারে খুচরা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার টাকায়।
খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস জানান, চীন থেকে আমদানিকৃত আদা ও রসুনের দাম এখনও অতিরিক্ত বাড়েনি। তবে সরবরাহ কিছুটা কম। তিনি বলেন, সরবরাহ পরিস্থিতির ওপরই দাম নির্ভর করবে। ঈদের আগে সরবরাহ বাড়লে দাম স্থিতিশীল থাকতে পারে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরিফ আল-আমিন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে মসলা আমদানি হয়। তাই আমদানি কিছুটা কমলেও বাজারে সংকট হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তিনি আরও জানান, অর্থবছরের এখনো অনেক সময় বাকি আছে। এ সময়ে আরও মসলা আমদানি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মসলা আমদানিতে বড় পতন হলেও বাজারে সরাসরি সংকটের আশঙ্কা আপাতত নেই। তবে পেঁয়াজ ও রসুনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে আমদানির বড় ধস ভবিষ্যৎ দামের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে—এমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে সামগ্রিক চিত্র।

