দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় নারীদের অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়ছে। অনলাইনভিত্তিক পোশাক বিক্রি, হস্তশিল্প, খাদ্যপণ্য, বিউটি কেয়ার কিংবা কৃষিভিত্তিক নানা উদ্যোগে এখন অনেক নারী সফলভাবে কাজ করছেন। তবে ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় মূলধনের সংকট। ব্যাংক ঋণের জটিল প্রক্রিয়া ও জামানতের শর্তের কারণে বহু নারী উদ্যোক্তা মাঝপথেই থেমে যেতে বাধ্য হন। এই বাস্তবতায় নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণসুবিধা নিয়ে এসেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ফাইন্যান্স।
প্রতিষ্ঠানটির ‘এসএমই পূর্ণতা’ নামের কর্মসূচির আওতায় নারী উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। এর মধ্যে ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত কোনো ধরনের জামানত ছাড়াই ঋণ পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে নতুন কিংবা ছোট পরিসরের উদ্যোক্তারাও সহজে অর্থায়নের আওতায় আসতে পারবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে দেশে অসংখ্য নারী ঘরে বসেই অনলাইন ব্যবসা পরিচালনা করছেন। কেউ ছোট কারখানা গড়ে তুলছেন, কেউ আবার বুটিক, প্রসাধনী বা খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত পণ্যের ব্যবসা করছেন। ব্যবসা বড় করতে প্রয়োজন হয় নতুন যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, দোকান বা কারখানার জায়গা, কর্মী নিয়োগ এবং বিপণন খরচের। পর্যাপ্ত পুঁজি না থাকায় এসব উদ্যোগ অনেক সময় টেকসই হয় না। বিশেষ করে জামানতভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থায় নারীরা তুলনামূলক বেশি সমস্যায় পড়েন।
আইডিএলসির এই ঋণসেবায় ঋণ পরিশোধের সময়সীমা রাখা হয়েছে এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত। উদ্যোক্তারা মাসিক সমান কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। ব্যবসার নগদ প্রবাহ বিবেচনায় কিস্তি নির্ধারণের সুবিধাও রাখা হয়েছে। সাধারণ এসএমই ঋণের তুলনায় এই সেবায় সুদের হারও তুলনামূলক কম বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ মাত্র ৫ শতাংশ সুদে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সুদের হার ৭ শতাংশের মধ্যেও রাখা সম্ভব বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। ঋণ আবেদন অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়া সাধারণ ব্যাংকের তুলনায় দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যেই ঋণ ছাড়ের কাজ শেষ করা যায়।
আইডিএলসির এসএমই বিভাগের প্রধান আদনান রশীদ জানান, ২০১৫ সালে চালু হওয়া এই কর্মসূচির মাধ্যমে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাত হাজার নারী উদ্যোক্তাকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে চার হাজার ২১৪ কোটি টাকা।
শুধু ঋণ সুবিধাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না এই উদ্যোগ। নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহেও সহায়তা দিচ্ছে আইডিএলসি। ট্রেড লাইসেন্স, কর শনাক্তকরণ নম্বর সনদ, পরিবেশগত ছাড়পত্র, বিএসটিআই অনুমোদন, ফায়ার সার্ভিস ক্লিয়ারেন্সসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে বিশেষ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে। হিসাবরক্ষণ, বিপণন, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, মূলধন ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন পরিকল্পনা এবং পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি বুটিক, সেলাই, বিউটি পারলার ও হস্তশিল্পের মতো কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ডিজিটাল ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিপণন, ই-মেইল মার্কেটিং এবং অনলাইন প্রচারণা কৌশল নিয়ে নারী উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য ‘পূর্ণতা ক্লাব’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম চালু রয়েছে। এর মাধ্যমে উদ্যোক্তারা নিজেদের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও নতুন ধারণা ভাগাভাগি করার সুযোগ পাচ্ছেন।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক হাজারের বেশি নারী উদ্যোক্তাকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। দেশের প্রতিটি আইডিএলসি এসএমই শাখায় ব্যবসা সহায়তা ডেস্কও চালু রয়েছে, যেখানে উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা নিতে পারেন।
ঋণের জন্য আবেদন করতে হলে উদ্যোক্তাদের কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, জাতীয় পরিচয়পত্র, টিআইএন সনদ, কর পরিশোধের প্রমাণপত্র, গত ১২ মাসের বিক্রির হিসাব, ভাড়ার রসিদ এবং ব্যাংক হিসাবের বিবরণী। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত তথ্যও চাওয়া হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন বাড়ানো গেলে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাত আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, স্থানীয় উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

