নতুন অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ইতিহাসের সর্বোচ্চ থোক বরাদ্দ রাখতে যাচ্ছে সরকার। মূলত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কৃষক সহায়তা এবং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই বড় বরাদ্দের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি চূড়ান্ত করেছে পরিকল্পনা কমিশন।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এডিপির মধ্যে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা রাখা হচ্ছে থোক ও বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে। যা মোট উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ৩৯ শতাংশ। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের জন্যই রাখা হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ২০১ কোটি টাকা। এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে সংরক্ষিত রাখা হচ্ছে আরও প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে অনুমোদিত ও চলমান প্রকল্পগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ৬১ শতাংশের কাছাকাছি।
সরকারি সূত্র বলছে, এই বিপুল থোক বরাদ্দের বড় অংশ সামাজিক নিরাপত্তা ও কৃষক সহায়তা কর্মসূচিতে ব্যয় হতে পারে। বিশেষ করে নতুন ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিকে ঘিরে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি জেলায় কৃষকদের হাতে ডিজিটাল কার্ড তুলে দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
এই কর্মসূচির আওতায় কৃষকরা সার, বীজ, সেচ সুবিধা, কৃষিঋণ, ভর্তুকি, কৃষিযন্ত্র, কৃষি বিমা এবং বাজার তথ্যসহ বিভিন্ন সুবিধা পাবেন। সরকার বলছে, ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে দেশের প্রায় চার কোটি পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি জানিয়েছেন, সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। তার ভাষ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন বড় মেগা প্রকল্প নেওয়ার বদলে চলমান প্রকল্পগুলো শেষ করার ওপর জোর দেওয়া হবে।
প্রস্তাবিত এডিপিতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এই খাতে রাখা হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা। এরপরই রয়েছে শিক্ষা খাত, যেখানে বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য খাতে ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রায় ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
তবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে থোক বরাদ্দের আকার বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা, অথচ একই খাতে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। একইভাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বরাদ্দের তুলনায় থোক বরাদ্দ কয়েক গুণ বেশি রাখা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এই বিভাগের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, যার বরাদ্দ প্রায় ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা।
এদিকে বড় আকারের এডিপি ও বিপুল থোক বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, চলতি অর্থবছরেই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর। জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ৩৬ শতাংশের কিছু বেশি। এমন পরিস্থিতিতে আরও বড় উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেছেন, বৈদেশিক ঋণের চাপ দ্রুত বাড়ছে এবং আগামী কয়েক বছর ঋণের কিস্তি পরিশোধে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হবে। তাই উন্নয়ন বাজেটে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে কার্যকর প্রকল্পে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বড় বিনিয়োগ জনকল্যাণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে থোক বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে অপচয় ও অনিয়মের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

