পঞ্চগড় জেলার একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান পঞ্চগড় সুগার মিল দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর ধরে বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। একসময় যে মিলের সাইরেনেই শুরু হতো হাজারো মানুষের কর্মব্যস্ত দিন, সেই প্রতিষ্ঠান এখন দাঁড়িয়ে আছে শুধুই স্মৃতি আর দীর্ঘশ্বাসের প্রতীকে।
এই মিলকে ঘিরেই একসময় গড়ে উঠেছিল জেলার অর্থনৈতিক চিত্র। আখ উৎপাদন থেকে শুরু করে চিনি উৎপাদন পর্যন্ত পুরো একটি কর্মচক্র সক্রিয় ছিল এখানে। কিন্তু মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। একদিকে শ্রমিকরা বেকার হয়েছেন, অন্যদিকে আখচাষিরাও ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন এই ফসল থেকে।
বন্ধ মিলের শ্রমিকরা এখন চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ ভ্যান চালাচ্ছেন, কেউ ইজিবাইক বা ছোট দোকানের সঙ্গে যুক্ত হলেও অধিকাংশই স্থায়ী কোনো আয়ের পথ খুঁজে পাননি। তাদের অভিযোগ, কাজের সন্ধানে অন্যত্র গেলেও সুযোগ মিলছে না।
অন্যদিকে আখ প্রক্রিয়াজাতকরণের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় জেলার উৎপাদিত আখ এখন পাঠাতে হচ্ছে পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও সুগার মিলে। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, সময় নষ্ট হচ্ছে এবং কৃষকদের লোকসানও বাড়ছে। অনেক কৃষক আখ চাষ ছেড়ে ভুট্টা ও ধানসহ অন্যান্য ফসলে ঝুঁকলেও প্রত্যাশিত লাভ পাচ্ছেন না।
শ্রমিক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, মিলটি চালুর দাবিতে বছরের পর বছর আন্দোলন চললেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বিভিন্ন সময় মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এসে আশ্বাস দিলেও বাস্তবে অগ্রগতি নেই বলেই তাদের দাবি।
তাদের ভাষ্যমতে, গত প্রায় ছয় বছরে একাধিক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি মিল পরিদর্শন করলেও চালুর বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সর্বশেষ গত শনিবার বর্তমান শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির মিলটি পরিদর্শন করেন এবং আখচাষিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি বন্ধ থাকা চিনিকলগুলো চালুর বিষয়ে সরকারের উদ্যোগের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
মিল কর্তৃপক্ষ জানায়, মিলের ট্রাক ও ট্রাক্টরসহ কিছু যন্ত্রপাতি ঠাকুরগাঁও সুগার মিলে স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে মিলের আওতায় ২২৩ একর জমি রয়েছে। পাঁচটি সাবজোন ও ৩১টি সেন্টারের মধ্যে আটটি সক্রিয় রয়েছে। এসব এলাকায় ৯৯০ একর জমিতে আখ চাষ হয়েছে। আগামী মৌসুমে আনুমানিক ১৮ থেকে ২০ হাজার মেট্রিক টন আখ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা চালু থাকা অন্য মিলগুলোতে সরবরাহ করা হবে। মিলটিতে আগে প্রায় এক হাজার দুইশ জনবল থাকলেও বর্তমানে মাত্র প্রায় ৭০ জন কর্মরত আছেন।
প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস অনুযায়ী, পঞ্চগড় সুগার মিলস লিমিটেড ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। দৈনিক এক হাজার ১৬ মেট্রিক টন আখ মাড়াই সক্ষমতা নিয়ে ১৯৬৯-৭০ সালে এর উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে এটি বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। লোকসানের কারণ দেখিয়ে ২০২০ সালে মিলটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে চিনি উৎপাদন ও আখ মাড়াই সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে।
মিল বন্ধ থাকায় শুধু শ্রমিক ও কৃষকই নয়, প্রতিষ্ঠানটিও ক্ষতির মুখে পড়ছে। যন্ত্রপাতি ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে, কিছু এলাকায় জমি দখল ও অনিয়মিত ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। মিল কর্তৃপক্ষ কৃষকদের আখ চাষে উৎসাহ দিলেও নিজেদের কিছু জমি অনাবাদি পড়ে আছে।
চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক ইউনুস আলী বলেন, “মিল বন্ধ হওয়ায় আমরা শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়েছি। পরিবার নিয়ে প্রায় ছয় বছর ধরে কষ্টে আছি। কোথাও কাজও পাচ্ছি না।” আরেক শ্রমিক মাহবুব আলম বলেন, “বারবার পরিদর্শন আর আশ্বাসই মিলছে, কিন্তু বাস্তব কোনো অগ্রগতি নেই। আমরা চাই দ্রুত মিলটি চালু করা হোক।”
পঞ্চগড় চিনিকল শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম বলেন, “আমরা বিভিন্ন সরকারের সময় থেকেই আন্দোলন করছি। আর আশ্বাস নয়, এখন বাস্তবায়ন চাই। ২০২০ সালে অজুহাত দেখিয়ে মিলটি বন্ধ করা হয়, এতে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
বোদা উপজেলার মনিপুকুরী এলাকার আখচাষি মনির আলম চৌধুরী বলেন, “আমি এবার পাঁচ একর জমিতে আখ চাষ করেছি। আগে বেশি জমিতে করতাম। মিল চালু হলে আমরা লাভবান হতাম। এখন আখ ঠাকুরগাঁও নিতে গিয়ে শুকিয়ে যায়, ওজন কমে যায়, লোকসান হয়।” সদর উপজেলার ডাঙাপাড়া এলাকার আখচাষি বসিরুল আলম বলেন, “জেলায় আখ চাষ অনেক হয়। মিল বন্ধ থাকায় আমরা নির্ভরতা হারিয়েছি। দ্রুত চালু হওয়া দরকার।”
মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতিকুজ্জামান জানান, বর্তমানে ৩১টি সেন্টারের মধ্যে আটটি সক্রিয় রয়েছে। ৯৯০ একর জমিতে আখ চাষ হয়েছে এবং আগামী অর্থবছরে আনুমানিক ১৬ হাজার মেট্রিক টন আখ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
সর্বশেষ শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, দেশের বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তবে আখচাষি, শ্রমিক এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি লাভজনক পরিচালনা—এই তিন বিষয় বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

