বিশ্ববাজারের চাপ, সাইবার হামলা এবং চীনের তীব্র প্রতিযোগিতার ধাক্কায় বড় সংকটে পড়েছে ব্রিটিশ বিলাসবহুল গাড়ি নির্মাতা জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার। এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক মুনাফা প্রায় পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছে। সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কোম্পানিটির মুনাফা কমেছে প্রায় ৯৯ শতাংশ।
প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে কর-পূর্ববর্তী মুনাফা নেমে এসেছে মাত্র ১ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ডে। আগের অর্থবছরে যেখানে মুনাফা ছিল প্রায় ২৫০ কোটি পাউন্ড। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বিলাসবহুল গাড়ি নির্মাতা এই প্রতিষ্ঠানের আয় ও মুনাফায় নজিরবিহীন পতন ঘটেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি বড় ধাক্কা একসঙ্গে সামলাতে না পারায় জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার এমন সংকটে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চাপ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্য নীতির কারণে। মার্কিন প্রশাসন বিদেশি গাড়ির ওপর অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক আরোপ করায় প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম বড় বাজারে বিক্রি কমে যায়।
প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। পরে যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে তা কমিয়ে ১০ শতাংশে নামানো হলেও ততদিনে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে যায়। উচ্চমূল্যের বিলাসবহুল গাড়ির চাহিদা কমে যাওয়ায় বিক্রি ও আয়—দুই ক্ষেত্রেই বড় ধাক্কা খায় কোম্পানিটি।
এর মধ্যেই গত বছরের আগস্টে বড় ধরনের সাইবার হামলার শিকার হয় জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার। ওই হামলার কারণে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ব্যবস্থা ও ডিজিটাল কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। কয়েক সপ্তাহের জন্য বিভিন্ন কারখানার কার্যক্রম সীমিত কিংবা বন্ধ রাখতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চীনের বাজারেও প্রতিষ্ঠানটি কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। স্থানীয় চীনা ব্র্যান্ডগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গাড়ি নির্মাতারাও নতুন নতুন মডেল বাজারে আনছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে প্রতিযোগিতা অনেক বেড়ে যাওয়ায় জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
সব মিলিয়ে কোম্পানিটির বার্ষিক রাজস্ব আয়ও বড়ভাবে কমেছে। আগের বছরের তুলনায় রাজস্ব কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৯০০ কোটি পাউন্ডে। এটি বৈশ্বিক অটোমোবাইল শিল্পে চলমান অস্থিরতারই আরেকটি বড় উদাহরণ বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
তবে সংকটের মধ্যেও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী কোম্পানির কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী পিবি বালাজি বলেছেন, সাইবার হামলা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে প্রতিষ্ঠানটি বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে তারা পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন।
ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে নতুন কয়েকটি বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারে আনার পরিকল্পনা করেছে কোম্পানিটি। এর মধ্যে বহুল আলোচিত রেঞ্জ রোভার ইলেকট্রিক মডেলও রয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেই আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্বব্যাপী গাড়ি শিল্প এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। জ্বালানি রূপান্তর, বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতিযোগিতা, সরবরাহ সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন—সব মিলিয়ে বড় বড় গাড়ি নির্মাতারা চাপের মধ্যে রয়েছে। সম্প্রতি জাপানের গাড়ি নির্মাতা হোন্ডা-ও দীর্ঘ সময় পর লোকসানের মুখ দেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছর বৈশ্বিক গাড়ি শিল্পের জন্য আরও কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে যারা দ্রুত বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল নিরাপত্তায় বিনিয়োগ বাড়াতে পারবে না, তাদের জন্য বাজারে টিকে থাকা আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে।

