বাংলাদেশে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআই প্রবাহ ২০২৫ সালে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যায়নি। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সামগ্রিক এফডিআই প্রবাহ বাড়ার পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে পুরোনো বিদেশি কোম্পানিগুলোর পুনর্বিনিয়োগ ও আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ। কিন্তু নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ প্রায় স্থির অবস্থায় রয়েছে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নতুন আগ্রহ এখনও সীমিত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে নিট এফডিআই প্রবাহ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। আগের বছর এ পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রবৃদ্ধির পুরো চিত্র ইতিবাচক নয়। কারণ নতুন বিনিয়োগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত ইকুইটি মূলধন মাত্র ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেড়ে ৫৫৪ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ নতুন বিদেশি উদ্যোক্তারা বড় আকারে বাংলাদেশে আসছেন না।
অন্যদিকে পুনর্বিনিয়োগ করা আয় বা রিইনভেস্টেড আর্নিংস বেড়েছে প্রায় ৩১৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে যেখানে এ খাতে বিনিয়োগ ছিল ১০৩ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩৪ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ বেড়ে হয়েছে ৭৮১ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা পুরোপুরি গুটিয়ে না নিয়ে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম ধরে রাখছে এবং কোথাও কোথাও সম্প্রসারণও করছে। তবে নতুন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখনও সতর্ক মনোভাব রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশের জন্য খুব অনুকূল ছিল না। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে নতুন গ্রিনফিল্ড প্রকল্প ঘোষণার হার প্রায় ১৬ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো বিনিয়োগকারীদের দুর্বল আস্থা ও ধীর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির চাপে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কয়েক বছর ধরে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশে এফডিআই কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে কঠিন পরিস্থিতিতেও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নেয়নি।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেছেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এফডিআই বৃদ্ধির হার ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। তবে সম্ভাবনার তুলনায় বিনিয়োগের পরিমাণ এখনও অনেক কম বলে তিনি স্বীকার করেন।
তার ভাষায়, বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল অর্থনীতির মতো বাংলাদেশও চাপের মুখে ছিল। তারপরও এফডিআই প্রবাহে প্রায় ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি একটি আশাব্যঞ্জক সংকেত। এখন মূল লক্ষ্য হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি ও নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।
তিনি আরও জানান, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকার নানা সংস্কার কার্যক্রম চালাচ্ছে। ব্যবসা সহজীকরণ, নীতিগত জটিলতা কমানো এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, যার মূল লক্ষ্য বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন।
বিশ্লেষকদের মতে, টেকসই এফডিআই প্রবৃদ্ধির জন্য শুধু পুরোনো বিনিয়োগকারীদের পুনর্বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়। নতুন শিল্প, প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে বড় বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হলে নীতিগত স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা এবং বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতির উন্নতি জরুরি। অন্যথায় এফডিআই বৃদ্ধির পরিসংখ্যান ইতিবাচক দেখালেও বাস্তবে নতুন বিনিয়োগের গতি সীমিতই থেকে যাবে।

