বাংলাদেশের তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় ও কৌশলগত অবস্থান চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য বড় সুবিধা তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ চায়না ক্লাব লিমিটেড–এর ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ এ হাফিজ। তাঁর মতে, উৎপাদন কার্যক্রম চীন থেকে সরিয়ে আনলেও বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ধরে রাখা সম্ভব হবে।
রাজধানীতে আয়োজিত এক দিনব্যাপী বিনিয়োগ ও ব্যবসাবিষয়ক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ চায়না ক্লাব লিমিটেড। এতে অংশ নেয় চীনের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রতিনিধিরা।
মোহাম্মদ এ হাফিজ বলেন, বাংলাদেশ শুধু একটি উৎপাদন কেন্দ্র নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়া ও আসিয়ান অঞ্চলের বাজারে প্রবেশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ গেটওয়ে। ভৌগোলিক অবস্থান, আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি এবং রপ্তানিমুখী শিল্প কাঠামোর কারণে দেশটি এখন বহুজাতিক কোম্পানির জন্য আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠছে।
তিনি জানান, বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা আনতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ অবকাঠামো সম্প্রসারণের কাজ চলছে, যাতে শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
শ্রম আইন, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং পেশাগত সেবার নীতিমালায় সংস্কারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক কাঠামো আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, বিদেশি বিনিয়োগ যেন শুধু ঋণ পরিশোধে আটকে না থেকে প্রকৃত উৎপাদন ও শিল্প সম্প্রসারণে কাজে লাগে, সে জন্য বিশেষায়িত সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ও কৌশলগত উপদেষ্টাদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ২৪ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে চীন থেকে বাংলাদেশে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২২ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, আর বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট–এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে চীনা বিনিয়োগকারীরা এখন উৎপাদন কেন্দ্র বৈচিত্র্য করার সুযোগ খুঁজছেন। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে সামনে এসেছে।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ বলেন, চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যাংকটি বিশেষ সেবা চালু করেছে। ম্যান্ডারিন ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত বিশেষ ডেস্কের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ ও বাণিজ্য কার্যক্রম সহজ করা হচ্ছে।
তিনি ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে সবুজ জ্বালানি, জলবায়ু প্রযুক্তি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস, স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ শিল্প, ফিনটেক, ডিজিটাল ব্যাংকিং, শিক্ষা ও পর্যটনের কথা তুলে ধরেন।
এদিকে সাস্টেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি–এর চেয়ারম্যান মুজাফফর আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি। শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং জ্বালানি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তিনি মনে করেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ খাতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের বড় সুযোগ এখন তৈরি হয়েছে।

