দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর-এর নতুন মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে আলোচনা চলমান থাকলেও এখন নজর পড়েছে বন্দরের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালে। বিদেশি ও স্থানীয় একাধিক প্রতিষ্ঠান এসব টার্মিনাল পরিচালনা ও আধুনিকায়নে আগ্রহ দেখানোয় বন্দর খাতে নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
বন্দর সূত্র বলছে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি প্রধান টার্মিনাল রয়েছে—জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি)। এর মধ্যে পিসিটি পরিচালনা করছে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল। অন্য টার্মিনালগুলো স্থানীয় অপারেটরদের অধীনে রয়েছে।
সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বৈশ্বিক বন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার আগ্রহ দেখিয়েছে। গত ৮ এপ্রিল দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-দুবাই যৌথ প্ল্যাটফর্ম বৈঠকে প্রতিষ্ঠানটি সিসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে তারা এনসিটি ও সিসিটিকে সমন্বিত একটি আধুনিক টার্মিনাল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে।
এর কিছুদিনের মধ্যেই সৌদি অপারেটর রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল জিসিবি ও সিসিটি আধুনিকায়ন এবং পরিচালনার আগ্রহ প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটি এ দুই টার্মিনালে ৬০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে।
শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠান নয়, স্থানীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতা বাড়ছে। বাংলাদেশের এমজিএইচ গ্রুপ আগে সিসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দিলেও এবার নতুন করে সিসিটি ও এনসিটি উভয় টার্মিনাল পরিচালনার প্রস্তাব জমা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি মডেলে এনসিটি পরিচালনার পরিকল্পনা তুলে ধরেছে।
এমজিএইচ গ্রুপের দাবি, তাদের প্রস্তাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ অন্যদের তুলনায় বেশি রাজস্ব পাবে। এনসিটিতে প্রতি কনটেইনারের বিপরীতে তারা বন্দর কর্তৃপক্ষকে ৯৮ দশমিক ৫০ ডলার রাজস্ব ভাগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। যেখানে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাব ছিল ৯৩ দশমিক ৫০ থেকে ৯৭ দশমিক ৫০ ডলারের মধ্যে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী আনিস আহমেদ জানিয়েছেন, বিদেশি অপারেটরদের তুলনায় তাদের অর্থায়ন ও পরিচালন ব্যয় কম হওয়ায় বেশি রাজস্ব দিয়েও লাভজনকভাবে পরিচালনা সম্ভব হবে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ১৫ বছরের চুক্তিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ১৬৮ কোটি ডলার আয় করতে পারে।
অন্যদিকে বর্তমানে জেনারেল কার্গো বার্থ পরিচালনায় থাকা ১২টি স্থানীয় অপারেটরের জোটও পিছিয়ে নেই। বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বোস্টোয়া জিসিবি আধুনিকায়ন ও পরিচালনার জন্য ৬২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা দিয়েছে। তারা দাবি করছে, দীর্ঘ দুই দশকের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জেটি, ইয়ার্ড, শেড ও গুদাম সম্প্রসারণের মাধ্যমে টার্মিনালকে আরও দক্ষ করা সম্ভব।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশি ও স্থানীয় উভয় পক্ষ থেকেই একাধিক প্রস্তাব পাওয়া গেছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সব প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বন্দর ব্যবহারকারী ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, নতুন অবকাঠামো নির্মাণের তুলনায় চালু টার্মিনাল পরিচালনা অনেক বেশি লাভজনক। কারণ নতুন প্রকল্পে দীর্ঘ সময় ও বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও বিদ্যমান টার্মিনাল থেকে তাৎক্ষণিক আয় সম্ভব। এ কারণেই বিদেশি ও স্থানীয় অপারেটরদের আগ্রহ মূলত চালু টার্মিনালগুলো ঘিরে।
চট্টগ্রাম বন্দর ২০২৫ সালে ৩৪ লাখের বেশি টিইইউস কনটেইনার পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে এনসিটিতে। ফলে এ টার্মিনালগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা এখন শুধু বাণিজ্যিক নয়, কৌশলগত গুরুত্বও বহন করছে।
বন্দর খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক অপারেটরদের অংশগ্রহণে প্রযুক্তি, দক্ষতা ও সেবার মান বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা, রাজস্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ইস্যু এখন অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বড় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

