আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ কর্মসূচির শর্ত পূরণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বড় পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বলে জানা গেছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে ডলারের দাম নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কমে গিয়ে চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে বাজারই মূল ভূমিকা পালন করতে পারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধানদের এক বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে ব্যাংকারদের খোলামেলা মতামত জানতে চাওয়া হয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বাইরে রাখা হয় বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন ব্যাংকারের ভাষ্য, বর্তমানে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কিছুটা বেড়েছে এবং রিজার্ভ পরিস্থিতিও আগের তুলনায় স্থিতিশীল। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন ডলার বাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপ কমাতে আগ্রহী। তবে একই সঙ্গে বাজারে যেন কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট, সিন্ডিকেট বা কারসাজি তৈরি না হয়, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারির কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিকভাবে ডলারের দর নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বাজারে একাধিক বিনিময় হার তৈরি হয়েছে। এতে ব্যাংক, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক এবং প্রবাসী আয় প্রেরণকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু হলে ডলারের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ সহজ হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্বচ্ছতা বাড়তে পারে।
তবে ব্যাংকারদের একাংশ বৈঠকে অভিযোগ করেন, বাস্তবে এখনো ডলারের দর নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মৌখিক নির্দেশনা ও চাপ থাকে। নির্ধারিত সীমার বাইরে লেনদেন হলে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়, কখনো কখনো পরিদর্শনও করা হয়। ফলে পুরোপুরি বাজারভিত্তিক ব্যবস্থায় যেতে হলে নীতিগত স্বচ্ছতা প্রয়োজন বলে মত দেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারের ওপর ডলারের দর ছেড়ে দিলে প্রথম দিকে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ চাহিদা বেড়ে গেলে ডলারের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। এতে আমদানি ব্যয়, জ্বালানি মূল্য, শিল্প উৎপাদন খরচ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে রপ্তানিকারক ও প্রবাসী আয় পাঠানো ব্যক্তিরা তুলনামূলক বেশি দর পেলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এ ঋণের বিভিন্ন কিস্তি ছাড়ের জন্য বেশ কিছু অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানির দাম বাজারভিত্তিক করা, কর আদায় বাড়ানো, খেলাপি ঋণ কমানো, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং বিনিময় হার আরও নমনীয় করা।
বৈঠকে গভর্নর আগাম ডলার বুকিং বা ফরওয়ার্ড বুকিং নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, অতিরিক্ত ফরওয়ার্ড বুকিং বাজারে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং এতে ডলারের দামে অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা দিতে পারে। তিনি ব্যাংকগুলোকে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান।
পরে ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তারা জানতে চান, কোন ধরনের কার্যক্রমকে ডলার বাজারে কারসাজি হিসেবে বিবেচনা করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা দেওয়া হবে কি না। কারণ বাজারভিত্তিক ব্যবস্থায় গেলে ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং সেক্ষেত্রে পরিষ্কার নির্দেশনা না থাকলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়ার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী নজরদারি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার অবৈধ লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। অন্যথায় বাজারমুখী নীতি স্বল্পমেয়াদে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে কৃত্রিমভাবে ডলারের দর নিয়ন্ত্রণ করে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে যাওয়া ছাড়া বিকল্প কমে আসছে।

