বাংলাদেশের স্টিল শিল্প এখন এক ধরনের চাপের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে জ্বালানি খরচ দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে চাহিদা কমে যাওয়ায় উৎপাদনও আশানুরূপ হচ্ছে না। এই দুই চাপ মিলিয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্প এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশ স্টিল প্রস্তুতকারক সমিতি গতকাল রাজধানীর অর্থনৈতিক প্রতিবেদক ফোরাম কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, বিদ্যুতের দাম আরও বাড়ানো হলে পুরো খাতটি গভীর সংকটে পড়ে যাবে। তাদের আশঙ্কা, উৎপাদন খরচ এমনভাবে বেড়ে যাবে যে অনেক কারখানা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হবে, এমনকি কিছু কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বর্তমানে স্টিল শিল্প এমনিতেই নানা ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ছে, ব্যাংক ঋণের সুদ বেশি, নির্মাণ খাতে চাহিদাও দুর্বল। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম আবার বাড়ানো হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে শিল্প খাতে বিদ্যুতের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে কিছু ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বেড়েছে প্রায় ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত। এই দুই খরচই স্টিল উৎপাদনের মূল ব্যয়ের বড় অংশ। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।
শিল্প মালিকরা আরও জানান, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ইতিমধ্যে পাইকারি বিদ্যুৎ দরের জন্য নতুন মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে শিল্প খাতে ব্যয় আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্টিল মালিকদের দাবি, শুধু সরাসরি বিদ্যুৎ বিলই নয়, অতিরিক্ত চার্জ যেমন চাহিদা চার্জ, মূল্য সংযোজন কর এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের দক্ষতা সংক্রান্ত জরিমানাও তাদের ওপর চাপ তৈরি করছে। এসব মিলিয়ে কার্যত বিদ্যুতের প্রকৃত খরচ আরও অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে।
সমিতির বক্তব্যে আরও বলা হয়, বর্তমানে অনেক বড় স্টিল মিল তাদের বিদ্যুৎ সংযোগ উচ্চ ভোল্টেজ লাইনের মাধ্যমে পেয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে সরবরাহজনিত ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম হলেও অতিরিক্ত চার্জের কারণে খরচ কমছে না, বরং বাড়ছে।
তারা আরও প্রশ্ন তুলেছে বিদ্যুৎ খাতের সক্ষমতা ব্যবস্থাপনা নিয়েও। শিল্প মালিকদের দাবি, উৎপাদন কমলেও প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ক্ষমতা খরচ হিসেবে পরিশোধ করা হচ্ছে, যা পুরো অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে।
স্টিল সমিতি সরকারের কাছে কয়েকটি প্রস্তাবও দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুতের দাম অপরিবর্তিত রাখা, চাহিদা চার্জ কমানো, অতিরিক্ত কর পুনর্বিবেচনা এবং উচ্চ ভোল্টেজ শিল্প গ্রাহকদের জন্য বিশেষ সুবিধা চালু করা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা জানান, অনেক কারখানা বর্তমানে লোকসানের ঝুঁকিতে পরিচালিত হচ্ছে। নির্মাণ খাতে চাহিদা কম, নতুন প্রকল্প কমে গেছে, আর ঋণের সুদের হারও বেশি—সব মিলিয়ে বাজার স্থবির হয়ে পড়েছে।
সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের স্টিল খাতে বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪০–৫০ লাখ টন। অথচ দেশে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টন। অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতার বড় একটি অংশই ব্যবহৃত হচ্ছে না।
তাদের ভাষায়, বর্তমানে অনেক মিল গড়ে মাত্র ৪০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। অর্থাৎ যে পরিমাণ উৎপাদনের জন্য কারখানা তৈরি করা হয়েছিল, তার অর্ধেকও এখন ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
সমিতির মহাসচিব সুমন চৌধুরী জানান, উৎপাদন খরচের প্রায় ৩০ শতাংশই আসে বিদ্যুৎ থেকে। ফলে বিদ্যুতের দাম সামান্য বাড়লেও পুরো উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
শিল্প মালিকদের মতে, নির্মাণ ও আবাসন খাতে মন্দা চলতে থাকলে এবং জ্বালানির দাম বাড়লে স্টিল শিল্পে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সব মিলিয়ে, স্টিল শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি খাতের সমস্যা নয়, বরং দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও নির্মাণ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। জ্বালানির দাম ও নীতিগত সিদ্ধান্ত এখন এই খাতের টিকে থাকা ও সংকোচনের মাঝে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

