দেশের পুঁজিবাজার, ব্যাংক খাত ও জাতীয় রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের আভাস দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আর্থিক খাতকে ধাপে ধাপে বিকেন্দ্রীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে জবাবদিহি ও কার্যকারিতা বাড়ে।
বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আয়োজিত এক সামিটে বক্তব্য দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি গত কয়েক বছরে নানা ধরনের অস্থিরতার ভেতর দিয়ে গেছে। এতে আর্থিক খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়েছে, কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থাপনাও ভেঙে পড়েছে।
তিনি বলেন, ব্যাংক কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ব্যাংকের মালিক প্রকৃত অর্থে শেয়ারহোল্ডাররা, আর ব্যাংকে থাকা অর্থ আমানতকারীদের। তাই ব্যাংক পরিচালনায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
অর্থমন্ত্রী ইঙ্গিত দেন, পুঁজিবাজার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং ব্যাংক খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনায় বিকেন্দ্রীকরণ আনা হলে সেবা আরও গতিশীল হবে এবং অনিয়ম কমবে। যদিও কী ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টাও দেশের আর্থিক খাতের দুর্বলতা নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, অতীতে অনেক আর্থিক প্রতিবেদন যথাযথ মানদণ্ড অনুসরণ না করে তৈরি হয়েছে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হয়েছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
তার ভাষ্য, সম্পদের প্রকৃত মূল্য যাচাই না করেই বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের সংস্কৃতি ব্যাংক খাতে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এর ফল হিসেবে খেলাপি ঋণ বেড়েছে, একই সঙ্গে একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারিও সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থমন্ত্রীর বিকেন্দ্রীকরণের বক্তব্য দেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘদিনের ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সমালোচনার প্রতিফলন। বিশেষ করে ব্যাংক খাতে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব, পুঁজিবাজারে অনিয়ম এবং কর প্রশাসনে জটিলতা নিয়ে বহুদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। কারণ ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, পুঁজিবাজারে আস্থাহীনতা এবং রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা—সব মিলিয়ে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় এখন বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তাদের মতে, বিকেন্দ্রীকরণ সফল করতে হলে স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ নিরীক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তনে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের সংকট ও বিনিয়োগে স্থবিরতার প্রেক্ষাপটে সরকার আর্থিক খাতে নতুন আস্থার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যকে সেই বৃহত্তর সংস্কার উদ্যোগের অংশ হিসেবেই দেখছেন অনেকে।

