দেশজুড়ে কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় লবণের তুলনায় সরকারের বিনামূল্যে সরবরাহ ছিল মাত্র ১৬ শতাংশ। ফলে বাজারে লবণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে অনেক মৌসুমি ও সাধারণ চামড়া ব্যবসায়ী পর্যাপ্ত লবণ সংগ্রহ করতে না পারায় চামড়ার গুণগত মান রক্ষায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এবারের ঈদুল আজহায় দেশে এক কোটির বেশি পশু কোরবানি হয়েছে। এসব পশুর চামড়া নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য প্রায় ৬০ হাজার টন লবণের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সরকারি উদ্যোগে বিতরণ করা হয়েছে ১০ হাজার টনেরও কম। ফলে বিপুল পরিমাণ চামড়া সংরক্ষণের দায়িত্ব পড়ে ব্যবসায়ী, মাদরাসা, এতিমখানা এবং স্থানীয় সংগ্রাহকদের ওপর।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্য অনুযায়ী, চামড়া সংরক্ষণের জন্য মোট ৫৯ হাজার ৫৯০ টন লবণের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে সরকারিভাবে প্রায় ৯ হাজার ৮০০ টন লবণ বিনামূল্যে বিতরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তবে শেষ পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে প্রায় ৯ হাজার ৪৬৩ টন, যা মোট প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রত্যাশিত চাহিদাপত্র না পাওয়া এবং কিছু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার কারণে পরিকল্পিত পরিমাণ লবণ বিতরণ সম্ভব হয়নি। এর পাশাপাশি বাজারে লবণের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
সরকারি জরিপে দেখা গেছে, ঈদের আগে দেশের বিভিন্ন জেলায় মোট প্রায় ৮৯ হাজার টনের বেশি লবণ মজুত ছিল। কাগজে-কলমে এই পরিমাণ মজুত চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট হলেও বাস্তবে অনেক ব্যবসায়ী উচ্চমূল্যের কারণে প্রয়োজনীয় পরিমাণ লবণ কিনতে পারেননি। ফলে চামড়া সংরক্ষণে ব্যয় বেড়ে যায় এবং অনেক সংগ্রাহক ক্ষতির মুখে পড়েন।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই লবণের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি শুরু হয়। এতে বড় ব্যবসায়ীরা কোনোভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও ছোট ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত লবণ ব্যবহার না করেই চামড়া সংরক্ষণ করতে হয়েছে, যা ভবিষ্যতে চামড়ার মান কমিয়ে দিতে পারে।
চামড়া ব্যবসায়ীদের মতে, সঠিক মাত্রায় লবণ ব্যবহার না হলে চামড়ায় পচন, দাগ বা অন্যান্য ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়ার প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে এবং রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিসিকের তথ্যমতে, দেশের আটটি বিভাগে পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে লবণ বিতরণ করা হয়েছে। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি চামড়া সংরক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেও উল্লেখযোগ্য অর্থ খরচ করা হয়েছে। সরকারের দাবি, বিনামূল্যে লবণ বিতরণের ফলে অন্তত ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগ্রহ করা চামড়ার একটি বড় অংশ নিরাপদে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীরা মনে করেন, শুধু মাদরাসা ও এতিমখানাকে লবণ দেওয়ার মধ্যেই উদ্যোগ সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যার পুরো সমাধান হয় না। কারণ চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের বড় অংশ পরিচালনা করেন সাধারণ ব্যবসায়ী ও মৌসুমি সংগ্রাহকেরা। তাদের জন্যও সহায়তা বা বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দেশের লবণ উৎপাদন প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে। আগাম বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় মিল ও পাইকারি পর্যায়ে দাম বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কোরবানির মৌসুমে চামড়া সংরক্ষণ কার্যক্রমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চামড়া শিল্প দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত। তাই কোরবানির মৌসুমকে কেন্দ্র করে লবণের বাজারে বিশেষ নজরদারি, পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় প্রতিবছরই চামড়া সংরক্ষণে একই ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে, যার ক্ষতি বহন করতে হবে পুরো শিল্পখাতকে।
তাদের মতে, শুধু চামড়া সংগ্রহ নয়, সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকে আরও পরিকল্পিত ও আধুনিক করতে পারলে দেশের চামড়া শিল্প নতুন গতি পাবে। আর সে জন্য কাঁচামাল সংরক্ষণের অন্যতম উপাদান লবণের সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখা এখন সময়ের দাবি।

