বাংলাদেশকে তুলার অন্যতম সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের শক্তিশালী অবস্থান এবং মার্কিন বাজারে পোশাক রপ্তানির সম্ভাবনাকে সামনে রেখে দেশটি নতুন বাণিজ্য কৌশল গ্রহণ করেছে। এর লক্ষ্য হলো বাংলাদেশে মার্কিন তুলা ও টেক্সটাইল কাঁচামালের ব্যবহার বাড়ানো এবং একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক আরও গভীর করা।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ দেশটির তুলা খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে একটি নতুন কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই পরিকল্পনার আওতায় আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন তুলার চাহিদা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়াকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কারণ দুটি দেশই বিশ্বের বড় পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে অন্যতম।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ যদি পোশাক উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা ও অন্যান্য টেক্সটাইল কাঁচামালের ব্যবহার বাড়ায়, তাহলে মার্কিন বাজারে কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক কমানো বা বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা দেওয়ার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় সরবরাহকারী। তবে শুল্ক কাঠামো এবং উৎপত্তি-সংক্রান্ত বিভিন্ন শর্তের কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা সীমিত হয়ে যায়। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, বাংলাদেশের বস্ত্র ও পোশাক শিল্পে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ তুলার প্রয়োজন হয়। দেশের নিজস্ব উৎপাদন চাহিদার তুলনায় খুবই কম হওয়ায় প্রায় পুরো চাহিদাই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। বর্তমানে বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের তুলা আমদানি করা হয়, যার একটি অংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন তুলার ব্যবহারও ধীরে ধীরে বেড়েছে।
তবে এই সম্ভাবনার পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো ‘রুলস অব অরিজিন’ বা পণ্যের উৎপত্তি-সংক্রান্ত শর্ত। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক সুবিধা পেতে একটি পোশাকে কত শতাংশ মার্কিন তুলা বা কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। ফলে শিল্প উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
আরেকটি বড় সমস্যা পরিবহন ও সরবরাহ সময়। প্রতিবেশী দেশ বা আঞ্চলিক বাজার থেকে তুলা সংগ্রহ তুলনামূলক দ্রুত সম্ভব হলেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে কাঁচামাল আসতে অনেক বেশি সময় লাগে। অনেক ক্ষেত্রে ৪৫ দিনেরও বেশি সময় প্রয়োজন হয়। দ্রুত ডেলিভারিনির্ভর বৈশ্বিক পোশাক বাজারে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যদি বাংলাদেশে মার্কিন তুলা সংরক্ষণের জন্য আঞ্চলিক গুদাম বা লজিস্টিক সুবিধা গড়ে তোলা যায়, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থার এই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। এতে উৎপাদন পরিকল্পনা আরও কার্যকর হবে এবং রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বাড়বে।
এদিকে বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিনিধিরা বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। আগামী দিনগুলোতে শুল্ক সুবিধা, উৎপত্তি-সংক্রান্ত শর্ত এবং কোটাভিত্তিক সুবিধার বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগ কেবল তুলা রপ্তানি বাড়ানোর কৌশল নয়; বরং এটি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষারও একটি প্রচেষ্টা। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, ফলে দুই দেশের মধ্যে বড় বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। মার্কিন তুলা ও অন্যান্য কাঁচামালের আমদানি বাড়লে সেই ব্যবধান কিছুটা কমতে পারে।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার এই সময়ে বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। তবে এর পূর্ণ সুবিধা পেতে হলে শুল্ক কাঠামো, সরবরাহ ব্যবস্থা, উৎপত্তি-সংক্রান্ত নীতিমালা এবং বাণিজ্যিক শর্তাবলি সম্পর্কে স্পষ্টতা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সঠিক নীতিগত সমঝোতা হলে এটি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

