বিশ্বের বিদ্যুৎ খাতকে সম্পূর্ণ কার্বনমুক্ত ও নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা ২০৫০ সালের মধ্যে প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব বলে নতুন এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যাপক বিনিয়োগ, বিপুল পরিমাণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণ এবং দেশগুলোর মধ্যে শক্তিশালী সহযোগিতা প্রয়োজন হবে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন।
সম্প্রতি বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী নেচার এনার্জি-তে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, সৌর ও বায়ুশক্তিনির্ভর বৈশ্বিক বিদ্যুৎব্যবস্থা গড়ে তুলে বিশ্বের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা।
গবেষকরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যুৎ ব্যবহার, উৎপাদন সক্ষমতা, আবহাওয়া, ভূমির প্রাপ্যতা এবং বিদ্যুৎ পরিবহন অবকাঠামোর তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি বিস্তৃত মডেল তৈরি করেন। সেখানে ২০৫০ সালের সম্ভাব্য বিদ্যুৎ চাহিদাকে ভিত্তি ধরে বছরের প্রতিটি ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা যাচাই করা হয়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, বৈশ্বিক পর্যায়ে ১৫ থেকে ২০ টেরাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা গেলে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প তৈরি করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও হ্রাস করা যাবে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অধিকাংশ সম্ভাবনাময় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী এলাকার তুলনামূলক কাছাকাছি অবস্থান করছে। অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদন কেন্দ্র ও ভোক্তা অঞ্চলের দূরত্ব ২০০ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যয় ও অবকাঠামোগত জটিলতা কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে এই রূপান্তরের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ভূমির ব্যবহার। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, শুধু সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্যই ৯০ লাখ হেক্টরের বেশি জমির প্রয়োজন হতে পারে। এত বড় পরিসরে জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কৃষি, পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রাকৃতিক সম্ভাবনা বেশি থাকায় আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল এবং নিম্ন আয়ের অনেক দেশ তুলনামূলক কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ পেতে পারে। এর ফলে এসব অঞ্চলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ শুধু পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখবে না; এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও বড় অবদান রাখবে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং ডিজিটাল সেবার বিস্তারে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ অন্যতম প্রধান শর্ত। সাশ্রয়ী ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎব্যবস্থা এসব খাতের উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
গবেষণায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর অর্থনৈতিক সুফলও তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে তেল, গ্যাস ও কয়লার আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামার কারণে অনেক দেশ জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে এ ধরনের অস্থিরতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুতের খরচও তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকবে।
এছাড়া বায়ুদূষণ কমে গেলে শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাস পাবে। ফলে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের সামগ্রিক উন্নতি ঘটবে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
গবেষণায় বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন পরিবর্তনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্মার্ট বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, চাহিদা কম থাকার সময়ে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং দক্ষ জ্বালানি ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে পুরো ব্যবস্থার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করলে বৈশ্বিক বিদ্যুৎব্যবস্থার ব্যয় প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে, যা বছরে প্রায় ১৮২ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের সমান।
গবেষণার উপসংহারে বলা হয়েছে, প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে শতভাগ নবায়নযোগ্য ও নিরবচ্ছিন্ন বৈশ্বিক বিদ্যুৎব্যবস্থা এখন আর কল্পনা নয়, বরং বাস্তবসম্মত একটি লক্ষ্য। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিপুল বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। গবেষকদের মতে, সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই বিশ্বের জ্বালানি খাতে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন সম্ভব।

