তৈরি পোশাকের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিবেচিত হয়ে আসছে চামড়া শিল্প। কিন্তু দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই খাতটি যেন টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। একসময় রপ্তানি আয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা এই শিল্প এখন ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে।
২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৪ শতাংশেরও বেশি এসেছিল চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই অবস্থান কমে এখন ২ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে।
চামড়া শিল্পের কাঁচামালের বড় অংশ আসে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দাম না পাওয়ায় প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মৌসুমি ব্যবসায়ী, এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলো চামড়া সংগ্রহ করলেও সঠিক বাজার না থাকায় অনেক সময় তা বিক্রি করা সম্ভব হয় না। যত পশু কোরবানি হয়, তার সব চামড়া কিনতেও আগ্রহ দেখায় না ট্যানারিগুলো। ফলে যে গরুর চামড়া ১৫–২০ বছর আগে প্রায় ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হতো, সেটিই এখন নেমে এসেছে প্রায় ৬০০ টাকার কাছাকাছি।
চামড়া ব্যবসায়ীদের মতে, এই সংকটের মূল কারণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে না পারা। সাভারের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) গত সাত বছরেও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে চামড়া কেনা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। এতে দেশীয় চামড়া শিল্প এখন মূলত চীনের বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যেখানে তুলনামূলকভাবে দাম অনেক কম।
২০১৭ সালে সরকার রপ্তানি বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে চামড়া শিল্পকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে ঘোষণা দেয়। ২০১৯ সালে চামড়া নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। এমনকি ২০২৪ সালের মধ্যে রপ্তানি ৫ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছিল কিন্তু বাস্তবে এসব পরিকল্পনা কার্যকর হয়নি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয় ছিল ৯৮ কোটি ডলার। পরের বছর তা বেড়ে ১৩০ কোটি ডলারে পৌঁছে, যা ছিল সর্বোচ্চ। ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকেই খাতটির পতন শুরু হয়।
২০১৯-২০ অর্থবছরে রপ্তানি কমে দাঁড়ায় ৮০ কোটি ডলারে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ১১৮ কোটি ডলারে পৌঁছায়। তবে এরপর আবার পতন শুরু হয়—২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০৪ কোটি ডলার এবং সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ১১৫ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রপ্তানি এসেছে প্রায় ৯৯ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে প্রবেশ করা যাচ্ছে না। একসময় দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বড় ক্রেতা ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের পর তারা কেনা বন্ধ করে দেয়। তার মতে, একটি ইটিপি স্থাপন করতে প্রায় ১০ কোটি টাকা লাগে, যা অনেক ট্যানারি মালিকের পক্ষে বহন করা কঠিন। সাভারের সিইটিপিও পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় আন্তর্জাতিক মান পূরণ সম্ভব হচ্ছে না।
চামড়া ব্যবসায়ী আফতাব খান বলেন, বাংলাদেশের চামড়া গুণগতভাবে ভালো হলেও আন্তর্জাতিক সনদ না থাকায় পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে। তার ভাষায়, একসময় জাপান ছিল সবচেয়ে বড় ক্রেতা, যারা ভালো দাম দিত। এখন মূল বাজার হয়ে দাঁড়িয়েছে চীন, যারা বিশ্বে সবচেয়ে কম দামে চামড়া কেনে। তিনি আরও বলেন, সাভারের সিইটিপি শুরু থেকেই কার্যকরভাবে কাজ করেনি, যার প্রভাব পুরো শিল্পে পড়ছে।
সাভার চামড়া শিল্পনগরীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম শাহনেওয়াজ জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে একটি রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। ইতালির একটি বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান সিইটিপির ত্রুটি ও আধুনিকায়ন নিয়ে কাজ করছে। তাদের প্রতিবেদন শিগগিরই পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, প্রতিবেদন অনুযায়ী সিইটিপিকে ইউরোপীয় মানে উন্নীত করা হবে।
এছাড়া ২০ থেকে ৩০টি বড় ট্যানারিকে নিজস্ব ইটিপি করার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অ্যাপেক্স শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে নিজস্ব ইটিপির ঘোষণা দিয়েছে। সামিনা, বেঙ্গল, ঢাকা হাইড অ্যান্ড স্কিন, আঞ্জুমান ও সালমা ট্যানারিও এ উদ্যোগে কাজ শুরু করেছে।
বর্তমানে দেশে আটটি প্রতিষ্ঠান এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে। এর মধ্যে পাইওনিয়ার প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে গোল্ড সার্টিফিকেট অর্জন করেছে। এ ছাড়া রিফ লেদার, অস্টান লিমিটেড, এবিসি লেদার, সুপারেক্স লেদার, এসএএফ ইন্ডাস্ট্রিজ, পাইওনিয়ার সিমোনা ট্যানিং এবং সং শিন লেদার এই সনদের আওতায় রয়েছে। সদর ট্যানারিও নতুন করে সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব ইটিপি স্থাপন করলে দ্রুত সনদ পাওয়া সম্ভব হবে। আর সিইটিপি আধুনিকায়ন হলে পুরো শিল্প আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা ফিরে পেতে পারে।

