দেশে জুতার দাম ক্রমাগত বাড়লেও মান নিয়ে ভোক্তাদের অভিযোগ কমছে না। একসময় যে জুতা কয়েক বছর ব্যবহার করা যেত, এখন তার স্থায়িত্ব অনেকটাই কমেছে বলে অভিযোগ করছেন ক্রেতারা। একই সঙ্গে দেশের বাজারে দ্রুত বিস্তার ঘটছে চীনে তৈরি কৃত্রিম চামড়ার জুতার। বড় ব্র্যান্ডের শোরুম থেকে শুরু করে ফুটপাতের দোকান—সবখানেই এসব জুতার আধিপত্য দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিবছর চীন থেকে তৈরি জুতা ও জুতা তৈরির উপকরণ আমদানি বাড়ছে। দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ায় কৃত্রিম চামড়ার জুতার চাহিদা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে সেগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের সার্দান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. সাইফুর রহমান জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে দেশের পরিচিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জুতা ব্যবহার করছেন। তাঁর মতে, আগে একটি জুতা কিনলে কয়েক বছর ব্যবহার করা যেত। এখন সেই স্থায়িত্ব আর নেই। অথচ দাম আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের বাদামতলী এলাকার আরেফিন ফুটওয়্যারের মালিক মোহাম্মদ ইমরান বলেন, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে জুতার দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। প্রতি জোড়া জুতায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত মূল্য গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। তিনি জানান, ৫ আগস্টের পর থেকে ব্যবসায় মন্দাভাব চলছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বাড়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সাধারণত এ সময় প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ জোড়া জুতা বিক্রি হতো। কিন্তু বর্তমানে বিক্রি অনেক কমে গেছে। একদিনে মাত্র একটি জুতা বিক্রির ঘটনাও ঘটেছে। তাঁর মতে, দেশে টেকসই জুতা উৎপাদন বাড়ানো গেলে দাম কমানো সম্ভব হতো এবং সাধারণ মানুষও উপকৃত হতেন। অথচ প্রতিবছর কোরবানির মৌসুমে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়।
চট্টগ্রামের জুতা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান নিউ ওয়েবের স্বত্বাধিকারী আইমান ইকবাল বলেন, চীন থেকে জুতা আমদানি করে আগের মতো লাভ করা যাচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে লোকসান গুনতে হচ্ছে। কারণ আমদানির পর গুদামে থাকা অবস্থাতেই অনেক জুতার বিভিন্ন অংশ খুলে যাচ্ছে, সোল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কিংবা ওপরের অংশে ফুসকার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
তাঁর ভাষ্য, এসব জুতা দেখতে আকর্ষণীয় হলেও দীর্ঘস্থায়ী নয়। দ্রুত মুনাফার আশায় অনেক ব্যবসায়ী আকাশপথে এসব জুতা আমদানি করেন, ফলে খরচও বেড়ে যায়। অন্যদিকে বাজারে ক্রেতাদের চাহিদা মূলত দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই দামে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
দেশে পর্যাপ্ত চামড়ার সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় শিল্প প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত না হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি নীতিগত ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, চামড়া সহজলভ্য হলেও জুতা কারখানা স্থাপন ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক উদ্যোক্তা আগ্রহী হলেও বিনিয়োগে এগোতে পারছেন না।
আইমান ইকবাল জানান, তাঁরও দেশে চামড়ার জুতার কারখানা গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বাজার পরিস্থিতি ও প্রতিযোগিতার বাস্তবতা বিবেচনায় বিষয়টি এখনও চ্যালেঞ্জিং। বর্তমানে দেশের জুতার বাজারের বড় অংশ চীন থেকে আসা কৃত্রিম চামড়ার পণ্যের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে তিনি মনে করেন।
দেশীয় জুতা শিল্পকে শক্তিশালী করতে বিদেশি জুতার ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ অথবা স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য কর-সুবিধা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর মতে, স্থানীয় উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ সহজ করা গেলে দেশের চামড়া শিল্প এবং জুতা খাত উভয়ই নতুন সম্ভাবনার মুখ দেখতে পারে।
দেশের জুতা বাজারে আমদানির চাপ ক্রমেই বাড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দর, চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে নিয়মিতভাবে জুতা ও জুতা তৈরির উপকরণ দেশে প্রবেশ করছে। বিশেষ করে চীন থেকে আসা কৃত্রিম চামড়ার জুতা ও উপকরণের পরিমাণ সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই তৈরি জুতা ও জুতা তৈরির উপকরণ আমদানি কয়েক গুণ বেড়েছে। আমদানির তালিকায় রয়েছে জুতার ওপরের অংশ, সোল, মাঝের রাবার এবং ফিতা।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে দেশে ২৮ লাখ ৪ হাজার ১৪২ কেজি তৈরি জুতা আমদানি হয়েছে, যার মূল্য ৫৩ লাখ ৩৭ হাজার ডলার। এ খাতে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৮৯ কোটি ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। এর আগের অর্থবছরে ২১ লাখ ৬২ হাজার ৬০৪ কেজি জুতা আমদানি হয়েছিল, যার মূল্য ছিল প্রায় ৪৪ লাখ ডলার। তখন রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ১৬৭ কেজি স্যান্ডেল আমদানি হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ১৮ লাখ ডলার। এ খাতে রাজস্ব এসেছে প্রায় সাড়ে ২৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে নারীদের জুতা আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৩৯০ কেজি, যার মূল্য প্রায় ৩ লাখ ডলার। এ থেকে রাজস্ব এসেছে ৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ খাতে আমদানি ও রাজস্ব উভয়ই বেড়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য বলছে, জুতা তৈরির উপকরণ আমদানিতে সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে ২ কোটি ১০ লাখ ৮৫ হাজার ডলার মূল্যের ১ কোটি ১৬ লাখ ৮৪ হাজার ৩৯৮ কেজি উপকরণ আমদানি হয়েছে। এ খাতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১৪৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
এর আগের অর্থবছরে একই সময়ে মাত্র ১১ লাখ ২৪ হাজার কেজি উপকরণ আমদানি হয়েছিল, যার মূল্য ছিল ২৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার। তখন রাজস্ব ছিল প্রায় ১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উপকরণ আমদানি প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে।
সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে জুতার সোল। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৭৪ লাখ ১৪ হাজার কেজি সোল আমদানি হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ ডলার। এ খাতে রাজস্ব আদায় হয়েছে সোয়া ৮৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় সোল আমদানিতে প্রায় ২০ গুণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার শরীফ আল আমিন বলেন, চীন থেকে মূলত কৃত্রিম চামড়ার জুতা ও স্যান্ডেল এবং জুতা তৈরির বিভিন্ন উপকরণ আসে। এসবের মধ্যে সোল, ওপরের অংশ এবং রাবার–ফিতা সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়। তাঁর মতে, প্রতিবছরই এ ধরনের আমদানি বাড়ছে, ফলে রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) চট্টগ্রামের পরিচালক সুবল চাকমা জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃত্রিম চামড়ার জুতা রপ্তানি হয়েছে ৫২২.৫৯ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে ৪৩৭.৩৮ মিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম। তবে চামড়ার জুতা রপ্তানিতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। একই সময়ে এ খাতে রপ্তানি হয়েছে ৫৫১.৮৪ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১.১৯ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের বাকি সময়েও রপ্তানি বাড়ার আশা করছেন তিনি।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মাহাবুবুল হাসান জানান, চট্টগ্রামে রিফ লেদার নামে একটি কারখানা অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত রয়েছে। তবে তালিকার বাইরে আরও কয়েকটি জুতা কারখানা চালু রয়েছে।

