বাংলাদেশের ওষুধশিল্প ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতে পরিণত হচ্ছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিক অগ্রগতির পর এবার প্রথমবারের মতো ২৫ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের মাইলফলক স্পর্শের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই খাতটি থেকে প্রায় ১৯ কোটি ৪৬ লাখ ডলার বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৯ কোটি ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ১৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। ফলে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ।
বিশেষ করে এপ্রিল মাসে রপ্তানি আয় ছিল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। একক মাস হিসেবে ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে ১০০ দশমিক ৬৭ শতাংশ। চলতি বছরের এপ্রিলে রপ্তানি হয়েছে ২ কোটি ৩৯ লাখ ৬০ হাজার ডলারের ওষুধ, যেখানে আগের বছরের একই মাসে আয় ছিল ১ কোটি ১৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার। বর্তমান ধারা বজায় থাকলে অর্থবছরের বাকি দুই মাসে আরও প্রায় পাঁচ কোটি ডলার আয় হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দেশের ওষুধ রপ্তানি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২৫ কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে বলে আশা করছেন রপ্তানিকারকরা।
১৫ বছরে আয় বেড়েছে পাঁচগুণ:
বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানির যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৫ সালে। তবে গত দেড় দশকে এই খাতের অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। ইপিবির তথ্য বলছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার। ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেই আয় বেড়ে দাঁড়ায় ২১ কোটি ৩১ লাখ ৬০ হাজার ডলারে। অর্থাৎ ১৫ বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় পাঁচগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে মাত্র একবার রপ্তানি আয় কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় ছিল ১৮ কোটি ৮৭ লাখ ৮০ হাজার ডলার। পরের অর্থবছরে তা ৭ শতাংশ কমে ১৭ কোটি ৫৪ লাখ ২০ হাজার ডলারে নেমে আসে। তবে এরপর আবার প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসে খাতটি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ২০ কোটি ডলারের বেশি আয় করে দেশের ওষুধশিল্প। ওই বছর রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ২০ কোটি ৫৪ লাখ ৮০ হাজার ডলারে এবং প্রবৃদ্ধি হয় ১৭ দশমিক ১৪ শতাংশ।
নতুন বাজারে বাড়ছে বাংলাদেশের উপস্থিতি:
দেশীয় ওষুধশিল্প এখন শুধু স্বল্পোন্নত দেশগুলোর বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশেও বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি বাড়ছে। বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে প্রায় ১ হাজার ২০০টি ওষুধপণ্য রপ্তানির জন্য নিবন্ধন পেয়েছে। বর্তমানে ১৫০টিরও বেশি দেশে এসব পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।
গত অর্থবছরে দেশের মোট ওষুধ রপ্তানির প্রায় অর্ধেক এসেছে তিনটি প্রতিষ্ঠান—বেক্সিমকো ফার্মা, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস এবং স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস থেকে। রপ্তানির তালিকায় তাদের পরেই রয়েছে রেনাটা, একমি, অ্যারিস্টোফার্মা, এসকেএফ, জেনারেল, বিকন ও ওরিয়ন ফার্মা।
ওষুধ রপ্তানিতে সাফল্য এলেও শিল্পটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে কাঁচামালের ওপর আমদানিনির্ভরতা। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে ওষুধের চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ উৎপাদিত হলেও মূল কাঁচামালের প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এ কারণে প্রতি বছর প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে।
ওষুধ উৎপাদনের প্রধান উপাদান অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) আমদানিতে দেশের কোম্পানিগুলো বছরে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে। এসব কাঁচামালের বড় অংশ আসে চীন ও ভারত থেকে।
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য প্রায় ১৭ বছর আগে এপিআই শিল্পপার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বর্তমানে সেখানে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করেছে। আরও দুটি প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক কাজ করছে। বাকি ২৩টি প্লট এখনও অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মুক্তাদিরের মতে, এপিআই পার্ক পুরোপুরি চালু হলে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদন বাড়বে এবং দেশের ওষুধশিল্প আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে।
তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে প্রয়োজনীয় উৎপাদন সক্ষমতা না থাকায় বাংলাদেশ দ্রুত মানসম্মত ও সাশ্রয়ী জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠছে। বর্তমানে দেশের ১০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পেয়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে গেলে ওষুধের কাঁচামাল আমদানির ব্যয় আরও বাড়তে পারে। তাই এখনই স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএআইএমএ) তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ৪০টির বেশি এপিআই উৎপাদন করেছে। যথাযথ আর্থিক সহায়তা ও নীতিগত প্রণোদনা পেলে দেশের মোট চাহিদার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কাঁচামাল দেশেই উৎপাদন সম্ভব।
সংগঠনটির সভাপতি এস এম সাইফুর রহমান বলেন, ভারত, চীন ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো এই শিল্পকে বিশেষ সহায়তা দিয়েছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের নীতিগত সমর্থন, সহজ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং শিল্পবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পাঁচ বিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন:
আবদুল মুক্তাদিরের মতে, স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ওষুধশিল্প থেকে রপ্তানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।
তার ভাষায়, তৈরি পোশাকশিল্পে বাংলাদেশ যেমন বৈশ্বিক সাফল্য দেখিয়েছে, ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনেও একই ধরনের সাফল্য অর্জনের সক্ষমতা দেশের রয়েছে। রপ্তানি বাড়াতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ইতোমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান সম্পন্ন করেছে। এখন প্রয়োজন সরকারি সহায়তা এবং স্থানীয় কাঁচামাল উৎপাদনের প্রসার।

