দেশে বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন উৎসাহিত করার নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবতায় অনেক ব্যবসায়ী এখনো কাস্টমস-সংক্রান্ত জটিলতা ও প্রশাসনিক হয়রানির অভিযোগ তুলছেন। বিশেষ করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত কাগজপত্রের দাবি, বিদ্যমান বিধি ও নির্দেশনার ভিন্ন ব্যাখ্যা এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে অনেক আমদানিকারক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, এসব কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আমদানি ব্যয়ও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি শিল্পকারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত রক সল্ট আমদানিকে কেন্দ্র করে এমন একটি ঘটনার অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দাবি, তারা প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিয়ম মেনেই পণ্য আমদানি করেছিল। কিন্তু বিল অব এন্ট্রি দাখিলের পর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ চালানটি আটকে দেয় এবং বিভিন্ন সংস্থার ছাড়পত্র ও অতিরিক্ত নথিপত্র চাওয়া শুরু করে। আমদানিকারকের অভিযোগ, এসব দাবির পক্ষে স্পষ্ট আইনি ভিত্তি দেখানো হয়নি।
দীর্ঘদিন পণ্য খালাস না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি আদালতের দ্বারস্থ হয়। আদালত তাদের পক্ষে সিদ্ধান্ত দিলেও ঈদুল আজহার আগে চালান খালাস সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বন্দরে জমে থাকা পণ্যের ওপর ধার্য হওয়া চার্জ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে কাঁচামাল সংকটে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধেও চাপ তৈরি হয়।
শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, একই ধরনের অভিযোগ আরও কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ব্যাখ্যা, পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত কিংবা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে পণ্য আটকে রাখছেন। এর ফলে পণ্য খালাসে বিলম্ব হচ্ছে এবং আমদানিকারকদের অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
একটি স্টিল স্ট্রাকচার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, তাদের পণ্য শ্রেণিকরণ নিয়ে কাস্টমসের একটি শাখা এমন ব্যাখ্যা দিয়েছে, যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিদ্যমান সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, পূর্বে একই ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে যে নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল, এবার তা মানা হয়নি। ফলে শুল্ক নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে এবং পণ্য দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে শুধু পণ্যের মূল্যই বাড়ে না, বন্দরে কনটেইনার আটকে থাকায় ডেমারেজ, স্টোরেজ ও অন্যান্য চার্জও দ্রুত বাড়তে থাকে। অনেক সময় এসব অতিরিক্ত ব্যয় মূল পণ্যের দামের কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি হয়ে যায়। এতে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অডিট, ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ শাখা। কিছু ব্যবসায়ীর দাবি, বড় ধরনের অনিয়ম বা রাজস্ব ঝুঁকির পরিবর্তে তুলনামূলক ছোট চালানগুলোর ওপর বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনাকারী অনেক প্রতিষ্ঠান অপ্রয়োজনীয় জটিলতায় পড়ছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য হলো, সব সিদ্ধান্ত আইন ও বিধিমালার আলোকে নেওয়া হয়। তাদের দাবি, প্রতিটি চালানের প্রকৃতি আলাদা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করা হয়ে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পূর্বের সিদ্ধান্ত বর্তমান চালানের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ না-ও হতে পারে।
এদিকে বন্ড সুবিধাভোগী কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানও পণ্য খালাসে বিলম্বের অভিযোগ তুলেছে। তাদের মতে, সব ধরনের কাগজপত্র সঠিক থাকার পরও অনেক সময় চালান বন্দরে আটকে রাখা হয়। এতে উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হয় এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহে সমস্যা দেখা দেয়।
পোশাক খাতের উদ্যোক্তারাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জন্য আমদানি করা যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোগত সরঞ্জাম খালাসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সরকারি প্রজ্ঞাপন ও ছাড় থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত ব্যয় গুনতে হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর মতে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাস্টমস প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব শুধু ব্যবসার খরচ বাড়ায় না, বরং দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে কাস্টমস ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং পূর্বনির্ধারিত নীতির ধারাবাহিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা আইনসঙ্গত যাচাই-বাছাইয়ের বিরোধী নন। তবে একই ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত, অতিরিক্ত ব্যাখ্যার দাবি এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে, তা কমানো প্রয়োজন। তাদের মতে, কাস্টমস ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত রাজস্ব সুরক্ষার পাশাপাশি বৈধ ব্যবসা ও শিল্প কার্যক্রমকে সহায়তা করা।
সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, দেশের শিল্পায়ন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে হলে কাস্টমস ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং ব্যবসাবান্ধব করতে হবে। অন্যথায় প্রশাসনিক জটিলতা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে উদ্যোক্তাদের একটি অংশ নিরুৎসাহিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।

