একসময় দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাত। তৈরি পোশাকশিল্পের পরই এ খাতকে বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু নানা কাঠামোগত সমস্যা, পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ঘাটতির কারণে সেই সম্ভাবনা ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক সনদ অর্জনে ব্যর্থতাই বর্তমানে বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের সবচেয়ে বড় সংকট।
রপ্তানি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এক দশক আগে চামড়া খাত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় ১৩০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল এবং জাতীয় রপ্তানিতে এর অবদান ছিল ৪ শতাংশেরও বেশি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই ধারা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে মোট রপ্তানিতে খাতটির অংশীদারিত্ব প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর পরিবেশ ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের মূল লক্ষ্য ছিল পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করা। কিন্তু স্থানান্তরের প্রায় এক দশক পরও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার পুরো সক্ষমতায় পরিচালিত না হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্ববাজারে চামড়া ব্যবসার ক্ষেত্রে বর্তমানে ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ বা এলডব্লিউজি সনদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অধিকাংশ বড় ব্র্যান্ড কেবল সেইসব প্রতিষ্ঠান থেকে চামড়া সংগ্রহ করে, যাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিবেশবান্ধব এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ ট্যানারি এই সনদ না পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্যের ক্রেতাদের কাছে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ হারাচ্ছে।
এর ফলে দেশের চামড়া কম দামে বিদেশে বিক্রি হচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বাংলাদেশ থেকে স্বল্পমূল্যে কাঁচা বা আংশিক প্রক্রিয়াজাত চামড়া কিনে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো তা উন্নত প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাত করে কয়েক গুণ বেশি দামে বিশ্ববাজারে বিক্রি করছে। এতে উৎপাদনের মূল সম্পদ বাংলাদেশে থাকলেও অধিকাংশ মুনাফা চলে যাচ্ছে বিদেশি কোম্পানির হাতে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু একটি রপ্তানি সংকট নয়; বরং মূল্য সংযোজনের সুযোগ হারানোর বড় উদাহরণ। যদি দেশে আন্তর্জাতিক মানের প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সনদ নিশ্চিত করা যেত, তাহলে একই চামড়া থেকে কয়েক গুণ বেশি আয় সম্ভব হতো।
বর্তমানে দেশে খুব সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে পেরেছে। তবে পুরো শিল্পখাতকে সেই মানে নিয়ে যেতে না পারলে সামগ্রিক রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চামড়া শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, শুধু কারখানা আধুনিকায়ন নয়, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানির প্রতিটি ধাপে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে সরকারি সহায়তা ও সহজ অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। বর্তমানে আর্থিক চাপের মধ্যে থাকা অনেক ট্যানারি মালিকের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা কঠিন। ফলে সরকারি নীতি সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের মূল সমস্যা কাঁচামালের অভাব নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্পন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে না পারা। দেশে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া উৎপাদিত হলেও তার পূর্ণ অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না।
তাদের মতে, পরিবেশগত মান নিশ্চিত করে দ্রুত আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন করতে পারলে চামড়া শিল্প আবারও দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে। অন্যথায় বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে এবং সম্ভাবনাময় এই শিল্প ধীরে ধীরে তার অবস্থান হারাতে পারে।
ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে যখন দেশে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতি চলছে, ঠিক তখনই চামড়া খাতের এই বাস্তবতা নতুন করে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান হলে দেশের চামড়া শিল্প আবারও রপ্তানি আয়ের অন্যতম বড় উৎস হিসেবে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

