দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কের কভারেজ ও সেবার মান উন্নয়নে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত মোবাইল সংযোগ আরও শক্তিশালী করতে নিম্ন-ফ্রিকোয়েন্সির অতিরিক্ত স্পেকট্রাম নিলামের মাধ্যমে মোবাইল অপারেটরদের কাছে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
টেলিযোগাযোগ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভবনের ভেতরে মোবাইল নেটওয়ার্কের মান উন্নত হবে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংযোগ বিস্তৃত হবে এবং কম টাওয়ার ব্যবহার করেই অপারেটররা বড় এলাকায় সেবা পৌঁছে দিতে পারবে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিটিআরসি এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে একটি কারিগরি কমিটি বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডের কার্যকারিতা, মূল্য নির্ধারণ এবং সীমান্ত এলাকায় সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত জটিলতা নিয়ে বিশদ পর্যালোচনা করে সুপারিশ জমা দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক হাজার মেগাহার্টজের নিচের স্পেকট্রাম মোবাইল সেবার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ এই ধরনের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সিগন্যাল অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে এবং ভবন বা দেয়ালের ভেতরেও তুলনামূলক ভালোভাবে প্রবেশ করতে সক্ষম। ফলে একই পরিমাণ অবকাঠামো ব্যবহার করে বৃহত্তর এলাকায় মানসম্মত সেবা দেওয়া সম্ভব হয়।
কমিটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্বল্পমেয়াদে দেশের জন্য এক্সটেন্ডেড জিএসএম বা ইজিএসএম ব্যান্ড তুলনামূলক বেশি কার্যকর হতে পারে। কারণ বর্তমানে ব্যবহৃত প্রায় সব মোবাইল ফোনেই এই ব্যান্ড সমর্থিত। ফলে অতিরিক্ত বিনিয়োগ ছাড়াই অপারেটররা দ্রুত সেবা সম্প্রসারণ করতে পারবেন।
তবে এই ব্যান্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে প্রতিবেশী দেশের নেটওয়ার্কের সঙ্গে ফ্রিকোয়েন্সি সংঘাত বা হস্তক্ষেপের ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে সিগন্যাল পর্যবেক্ষণ করা হয়।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, কিছু নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি ব্লকে রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলে সমস্যা তুলনামূলক কম হলেও রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলোতে উল্লেখযোগ্য হস্তক্ষেপের ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে একটি বড় অংশের স্পেকট্রাম ব্যবহারে দেশের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ভৌগোলিক এলাকা প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে আরেকটি অংশে হস্তক্ষেপের মাত্রা অনেক কম পাওয়া গেছে। সেখানে শুধু সীমিত কয়েকটি অঞ্চলে সমস্যা দেখা গেলেও দেশের অধিকাংশ এলাকায় স্বাভাবিকভাবে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে এই অংশটি মোবাইল অপারেটরদের কাছে বাণিজ্যিকভাবে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
কারিগরি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮৫০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড প্রযুক্তিগতভাবে আরও শক্তিশালী হলেও দেশের বেশিরভাগ মোবাইল ডিভাইসে এর সমর্থন সীমিত। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে এই ব্যান্ড ব্যবহারের সুযোগ তুলনামূলক কম। এ কারণেই স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় ইজিএসএম ব্যান্ডকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে আরেকটি বাস্তবতা হলো, দেশে এখনো স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর হার শতভাগ নয়। ফলে নতুন ব্যান্ড ব্যবহারের মাধ্যমে ডেটা সেবার পূর্ণ সুবিধা শুরুতে সব গ্রাহকের কাছে পৌঁছাবে না। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহারকারী সরাসরি এর সুফল পেতে পারেন।
নিলামের জন্য বিবেচনায় থাকা স্পেকট্রামকে কয়েকটি ব্লকে ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান অপারেটরদের চাহিদা এবং বাজার বাস্তবতা বিবেচনায় এ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যেহেতু একাধিক অপারেটর একই স্পেকট্রামের জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে, তাই প্রতিযোগিতামূলক নিলামের মাধ্যমেই বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মূল্য নির্ধারণেও কিছু নমনীয়তার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। যেসব স্পেকট্রামে হস্তক্ষেপের ঝুঁকি কম, সেগুলোর জন্য তুলনামূলক বেশি ভিত্তিমূল্য নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে সীমান্তজনিত সমস্যার কারণে যেসব ব্লক পুরো দেশে ব্যবহার করা যাবে না, সেগুলোর ক্ষেত্রে মূল্যছাড় দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বিটিআরসির কর্মকর্তারা মনে করছেন, নতুন স্পেকট্রাম বরাদ্দের মাধ্যমে মোবাইল অপারেটরদের সক্ষমতা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে উচ্চগতির ডেটা ও ভয়েস সেবার মান উন্নত হবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলে ডিজিটাল সংযোগ বিস্তারে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল অর্থনীতি, ই-গভর্ন্যান্স, অনলাইন শিক্ষা ও মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবার বিস্তার বিবেচনায় দেশের জন্য উন্নত টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো এখন অপরিহার্য। তাই সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির মাধ্যমে এই স্পেকট্রাম নিলাম বাস্তবায়ন করা গেলে তা দেশের ডিজিটাল রূপান্তর প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।

