বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময়সূচি কিছুটা পিছিয়ে যেতে পারে। তবে সেই সুযোগ নির্ভর করছে অর্থনীতি ও প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাস্তব সংস্কারের অগ্রগতির ওপর। জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী সংস্থা ইঙ্গিত দিয়েছে, শুধু সময় বাড়ানোর আবেদন যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে থাকতে হবে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা, বাস্তবায়নের রোডম্যাপ এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি।
বর্তমান আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশ উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধ জানায়। সরকারের যুক্তি ছিল, গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক মহামারি, আন্তর্জাতিক সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে কাঙ্ক্ষিত প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়নি। সেই কারণে ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সাল পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় চাওয়া হয়।
তবে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) মনে করছে, দীর্ঘ সময়ের পরিবর্তে তুলনামূলক স্বল্প মেয়াদের সময় বৃদ্ধি অধিক কার্যকর হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা, এক থেকে দুই বছরের অতিরিক্ত সময় পাওয়ার সম্ভাবনাই বর্তমানে বেশি। তবে এর জন্য বাংলাদেশকে দ্রুত সংস্কার-অঙ্গীকার আন্তর্জাতিক মহলের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।
সিডিপির সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় সীমা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা—সব ক্ষেত্রেই দেশটি যোগ্যতা অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস অনুযায়ীও নিকট ভবিষ্যতে এসব সূচকে বড় ধরনের অবনমন ঘটার আশঙ্কা কম।
তার পরও উদ্বেগের জায়গা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা, বৈশ্বিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তা, জ্বালানির মূল্য অস্থিরতা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সিডিপির মতে, এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে উত্তরণ-পরবর্তী সময় আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
কমিটির মূল্যায়নে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার নানা সীমাবদ্ধতা দূর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সক্ষম এমন বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সিডিপি স্পষ্টভাবে বলেছে, সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া শুধুমাত্র সময় বৃদ্ধি টেকসই উত্তরণে কতটা সহায়ক হবে, তা পরিষ্কার নয়। ফলে বাড়তি সময়কে কোনোভাবেই সংস্কার বিলম্বের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত হবে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য যেমন মর্যাদার বিষয়, তেমনি এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জও। বর্তমানে বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত বা বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা ভোগ করছে। এলডিসি মর্যাদা শেষ হলে ধীরে ধীরে এসব সুবিধার অনেকগুলো কমে যাবে। ফলে রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা ও বাজার বৈচিত্র্য বাড়ানোর বিকল্প নেই।
জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এখন গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সামনে। সিডিপি তাদের মূল্যায়ন জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) কাছে পাঠিয়েছে। আগামী বৈঠকে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। এর আগে বাংলাদেশকে সংস্কার পরিকল্পনা, সময়সূচি এবং বাস্তবায়ন কৌশল তুলে ধরতে হবে। এরপর ইকোসকের সুপারিশের ভিত্তিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
যদিও ইকোসকের সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ, তবুও প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ সরাসরি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কাছেও সময় বৃদ্ধির আবেদন জানাতে পারবে। অতীতে আফ্রিকার কিছু দেশ বিশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে এমন সুযোগ পেয়েছে।
এদিকে সিডিপির ইতিবাচক অবস্থানের পর সরকারও দ্রুত সক্রিয় হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আর্থিক খাত সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, ওষুধশিল্পে মেধাস্বত্বসংক্রান্ত আইন হালনাগাদ, ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, কর অব্যাহতি কমানো, সরকারি সেবায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণ, বন্দর ব্যয় হ্রাস এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণসহ প্রায় ২৫টি খাতে সংস্কারের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
জানা গেছে, সংস্কার কার্যক্রম তদারকির জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মতামত সংগ্রহের পর একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে আন্তর্জাতিক মহলে উপস্থাপন করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। একদিকে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী উত্তরণ, অন্যদিকে সীমিত সময় বৃদ্ধি নিয়ে আরও প্রস্তুতি গ্রহণ। তবে যেকোনো পথেই সফল হতে হলে অর্থনীতি, রাজস্ব, ব্যাংকিং ও সুশাসন খাতে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধানে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে। কারণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পরিবর্তনের প্রমাণ দেখতে চায়।
বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এলডিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। গত কয়েক দশকের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির ফলে দেশটি এখন উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে। তবে চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে আগামী কয়েক মাসে সংস্কার কর্মসূচি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তার ওপর। সেই অর্থে এলডিসি উত্তরণের প্রশ্নটি এখন কেবল সময় বাড়ানো বা না-বাড়ানোর বিতর্ক নয়; বরং দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কাঠামো কতটা শক্তিশালী করা যায়, সেটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

