আসন্ন জাতীয় বাজেটকে ঘিরে আলোচনায় থাকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। সম্পদের ওপর সরাসরি কর আরোপ এবং বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরকার সরে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। একই সঙ্গে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর ব্যাপকভিত্তিক কর আরোপের ধারণাও পুনর্বিবেচনার মুখে পড়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও রাজস্ব প্রশাসনের একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে কিংবা বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিতে পারে—এমন প্রস্তাবগুলো নতুন করে মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বহুল আলোচিত ওয়েলথ ট্যাক্স বা সম্পদ করের বাস্তবায়ন আপাতত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
প্রাথমিকভাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পরিকল্পনা ছিল, নির্দিষ্ট সীমার ওপরে থাকা সম্পদের মূল্যের ওপর সরাসরি কর আরোপ করা। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং সম্পদ বৈষম্য কমানোর একটি নতুন পথ তৈরি করা। রাজস্ব কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, পরিকল্পনাটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ করা সম্ভব হতো।
তবে নীতিনির্ধারকদের একাংশের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া সম্পদ কর চালু করলে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে দেশের সম্পদ নিবন্ধন ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে কর নির্ধারণ নিয়ে ব্যাপক বিরোধ, আপত্তি এবং আইনি জটিলতার সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মধ্যেও এ নিয়ে মতভেদ দেখা গেছে। একদল মনে করেন, সম্পদ কর ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে। তাদের মতে, আয়কর ব্যবস্থার বাইরে সম্পদের ওপর নির্দিষ্ট কর আরোপ করলে রাষ্ট্রের রাজস্বভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
অন্যদিকে আরেকটি অংশের যুক্তি হলো, সম্পদের সঠিক হিসাব ও মূল্য নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য কাঠামো তৈরি না করে এ ধরনের কর চালু করলে তা উল্টো বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে। কারণ যারা নিয়মিত সম্পদের তথ্য প্রকাশ করেন, তারাই করের আওতায় আসবেন; অথচ গোপন সম্পদের মালিকরা সহজেই নজর এড়িয়ে যেতে পারেন।
এদিকে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কথিত কালো টাকা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ দায়মুক্তি দেওয়ার যে ধারণা আলোচনায় ছিল, সেটিও এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। সরকারের ভেতরে এ বিষয়ে নতুন করে আপত্তি তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, এমন সুযোগ দেওয়া হলে সৎ করদাতাদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে এবং করনৈতিক ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
বর্তমানে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কর ও জরিমানা পরিশোধের বিধান রয়েছে। তবে অর্থের উৎস সম্পর্কে তদন্ত বা প্রশ্ন তোলার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ নয়। আলোচনায় থাকা নতুন প্রস্তাবে অর্থের উৎস নিয়ে কোনো সরকারি সংস্থাই প্রশ্ন তুলতে পারবে না—এমন একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করার চিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু সম্ভাব্য সমালোচনা ও বিতর্কের কারণে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে, অন্যদিকে দুর্নীতি বা কর ফাঁকির মাধ্যমে অর্জিত অর্থকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। ফলে সরকারকে বিনিয়োগ উৎসাহ এবং করনৈতিক ন্যায্যতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।
মোটরসাইকেল খাতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আগে সব ধরনের মোটরসাইকেলের ওপর নতুন কর আরোপের বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও এখন সেই অবস্থান থেকে সরে আসার আলোচনা চলছে। পরিবর্তে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বা বেশি সিসির মোটরসাইকেলের ওপর এককালীন কর আরোপের বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের ওপর চাপ কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
একইভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর ব্যাপক কর আরোপের পরিকল্পনাও পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ এ খাতের সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যআয়ের বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা জড়িত। ফলে অতিরিক্ত কর আরোপ করলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কয়েক বছর আগে সীমিত করের বিনিময়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দিয়ে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আদায় করেছিল। তবে সেই সিদ্ধান্ত ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে এবং করদাতাদের মধ্যে নৈতিকতা ও সমতার প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। সেই অভিজ্ঞতাও বর্তমান সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আসন্ন বাজেটের আগে এসব প্রস্তাব নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও না হলেও সাম্প্রতিক আলোচনার ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, সরকার এমন একটি করনীতি গ্রহণ করতে চায় যেখানে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্য বজায় থাকবে, কিন্তু সাধারণ জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ কিংবা বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের ঝুঁকি কম থাকবে।
ফলে এবারের বাজেটে সম্পদ কর, কালো টাকা বিনিয়োগে দায়মুক্তি এবং মোটরসাইকেল কর—এই তিনটি বিষয়ই শেষ মুহূর্তে বড় ধরনের পরিবর্তনের সাক্ষী হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা।

