মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই এসব দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সময় বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে প্রায় ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। নতুন প্রস্তাবিত ১০ শতাংশ শুল্ক যুক্ত হলে মোট শুল্কের হার প্রায় ২৬ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাবে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্য বিক্রি আগের তুলনায় আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।
মার্কিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি রোধে কার্যকর আইন ও নীতিমালা বাস্তবায়ন করেছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে যেসব দেশ এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, তাদের জন্য শুল্কের হার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়ন কিছুটা ভিন্ন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অতীতে বাংলাদেশ এ ধরনের পণ্য আমদানির বিরুদ্ধে কঠোর কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি। তবে সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে হওয়া পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ভবিষ্যতে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই কারণেই বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক কম, অর্থাৎ ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
তবে এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, বাংলাদেশের পোশাক খাতে জোরপূর্বক শ্রমের কোনো অস্তিত্ব নেই। শ্রমিক সংকট বা উৎপাদন ব্যবস্থার বাস্তবতায় এমন কোনো চর্চার প্রয়োজনও পড়ে না। ফলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশেষ করে পোশাক খাতকে ঘিরে মার্কিন প্রতিবেদনে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, তা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ তুলা চীন থেকে আমদানি করে থাকে। সেই তুলার একটি অংশ এমন অঞ্চল থেকে আসতে পারে, যেখানে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। পরে সেই তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হয়। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এতে তাদের বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে অসাম্য সৃষ্টি হয়।
এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে চীনের শিনজিয়াং অঞ্চল। দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা দেশগুলো ওই অঞ্চলে তুলা, পলিসিলিকন এবং কিছু শিল্পপণ্যের উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগ তুলে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, এসব কাঁচামাল বিভিন্ন দেশে গিয়ে পুনরায় প্রক্রিয়াজাত হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করছে।
বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কার মতো পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর নামও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল বাংলাদেশের নয়; বরং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বৃহত্তর বাণিজ্য ও মানবাধিকার ইস্যু।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত শুল্ক কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়তে পারে তৈরি পোশাক খাতের ওপর। কারণ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। অতিরিক্ত শুল্কের ফলে বাংলাদেশি পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে, যার ফলে ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রস্তাব বাস্তবায়নের আগে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। ফলে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে সক্রিয় উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় মানবাধিকার, শ্রম অধিকার এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই শুধু শুল্ক এড়ানোর জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এসব বিষয়ে আরও শক্তিশালী অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্তাব বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য একটি নতুন সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী দিনে বিষয়টি কোন দিকে যায়, তার ওপর নির্ভর করবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভোক্তা বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ভবিষ্যৎ অবস্থান।

