দেশের শিল্প খাত এখন এক কঠিন সময় পার করছে। নতুন বিনিয়োগের গতি কমে গেছে, উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলোতেও চাহিদার ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আরোপের প্রস্তাব, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন। সব মিলিয়ে দেশের রপ্তানি খাত ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত মে মাসে বাংলাদেশ থেকে ৪৪০ কোটি ২৮ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এপ্রিল মাসের তুলনায় কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আয় কমেছে ৭ দশমিক ০৯ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে দেশের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৭৯ কোটি ডলার। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ৪ হাজার ৪৯৪ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা পোশাক খাতে
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। ফলে এই খাতের যেকোনো নেতিবাচক পরিবর্তন পুরো অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
মে মাসে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় কমেছে ২৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। গত বছরের মে মাসে যেখানে এই খাত থেকে ৩৯১ কোটি ৯০ লাখ ডলার আয় হয়েছিল, সেখানে চলতি বছরের একই মাসে আয় নেমে এসেছে ৩১৪ কোটি ডলারে।
নিটওয়্যার ও ওভেন—দুই ধরনের পোশাক রপ্তানিতেই পতন দেখা গেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, ক্রেতাদের মূল্য কমানোর চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এই পতনের অন্যতম কারণ।
অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি পোশাক শিল্প। এই খাতের দুর্বলতা পুরো রপ্তানি খাতকে নেতিবাচক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। যদিও জাতীয় নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতি কিছুটা আস্থা ফিরে এসেছে, তবুও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব এখনো কাটেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নিয়ে উদ্বেগ
রপ্তানিকারকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক প্রস্তাব। সম্প্রতি বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
অভিযোগ করা হয়েছে, এসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
এই প্রস্তাব কার্যকর হলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে মোট শুল্কের হার প্রায় ২৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ফলে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত, বিশেষ করে পোশাক শিল্প, আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শুধু পোশাক নয়, ক্ষতিগ্রস্ত অন্য খাতও
রপ্তানি আয়ের পতন শুধু পোশাক শিল্পে সীমাবদ্ধ নেই। মে মাসে কৃষি, চামড়া ও কাগজজাত পণ্যসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়েছে ৬ কোটি ৭১ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ কম। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ১২ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ৯৩ লাখ ডলারে। অন্যদিকে কাগজ ও কাগজজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে প্রায় ২৩ শতাংশ।
তবে সব খাতে চিত্র এক নয়। প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি ১৯ দশমিক ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্লাস্টিক পণ্যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং কাঠ ও কাঠজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য ৮৬ শতাংশ।
কেন কমছে রপ্তানি?
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ এবং নতুন শুল্কের সম্ভাবনা ক্রেতাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, কয়েক মাস ধরেই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইউরোপীয় বাজারেও প্রতিযোগিতা বেড়েছে। অনেক দেশ কম দামে পোশাক সরবরাহ করছে, ফলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য বাজার ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।
শিল্প খাতে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, দেশের স্পিনিং মিল ও গার্মেন্ট কারখানাগুলোর একটি অংশ ইতোমধ্যে উৎপাদন কমিয়েছে, আর কিছু প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন—দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
তাদের মতে, রপ্তানি খাতকে টিকিয়ে রাখতে নগদ সহায়তা ও প্রণোদনা বৃদ্ধি, কাঁচামাল আমদানিতে কর সুবিধা, বন্দরের খরচ কমানো এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বর্তমান পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। রপ্তানি আয় কমে যাওয়া মানে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে যাওয়া নয়; এর প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়োপযোগী নীতি সহায়তা, শিল্পবান্ধব বাজেট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। অন্যথায় রপ্তানি খাতের বর্তমান চাপ আগামী মাসগুলোতে আরও গভীর হতে পারে।
আগামী বাজেটে সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, এখন সেই দিকেই তাকিয়ে আছে দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পমহল।

