বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় একটি আর্থিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন মাশুল বা হুইলিং চার্জ বৃদ্ধির ফলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এবং পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর বার্ষিক আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
কোম্পানির হিসাব অনুযায়ী, নতুন মাশুল কার্যকর হলে বছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সম্ভাব্য আয় নির্ভর করবে জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে কত পরিমাণ বিদ্যুৎ সঞ্চালিত হচ্ছে এবং দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদা ও উৎপাদন পরিস্থিতির ওপর।
কেন বাড়ছে আয়?
পাওয়ার গ্রিডের প্রধান কাজ হলো দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানিগুলোর কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া। এই সেবা দেওয়ার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটি একটি নির্ধারিত মাশুল পায়, যাকে বলা হয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন মাশুল বা হুইলিং চার্জ।
সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বিদ্যুৎ সঞ্চালনের এই হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন হার চলতি জুন মাস থেকেই কার্যকর হচ্ছে। ফলে জাতীয় গ্রিড ব্যবহার করে বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য বিতরণ কোম্পানিগুলোকে আগের তুলনায় বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হবে, যার সরাসরি সুবিধা পাবে পাওয়ার গ্রিড।
নতুন হার কত নির্ধারণ করা হয়েছে?
সরকার ঘোষিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী বিভিন্ন ভোল্টেজ স্তরে সঞ্চালন মাশুল বাড়ানো হয়েছে।
২৩০ কেভি লাইনের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট সঞ্চালন মাশুল ০.৩০৫৭ টাকা থেকে বেড়ে ০.৩৭৮৯ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
১৩২ কেভি লাইনের ক্ষেত্রে হার ০.৩০৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ০.৩৮২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া ৩৩ কেভি লাইনের ক্ষেত্রে মাশুল ০.৩১৮৪ টাকা থেকে বেড়ে ০.৩৮৯৭ টাকায় পৌঁছেছে।
অর্থাৎ সব স্তরেই উল্লেখযোগ্য হারে মাশুল বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা পাওয়ার গ্রিডের রাজস্ব বৃদ্ধির পথ খুলে দিয়েছে।
পুঁজিবাজারে ইতিবাচক বার্তা
বিদ্যুৎ সঞ্চালন মাশুল বৃদ্ধি সংক্রান্ত তথ্যটি কোম্পানিটি মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে প্রকাশ করেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।
সাধারণত কোনো কোম্পানির আয় ও মুনাফা বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হলে তা বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে নতুন এই সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারে কোম্পানিটির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
বিদ্যুৎ খাতে কী প্রভাব পড়বে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় গ্রিডের সম্প্রসারণ, শিল্প খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার ফলে আগামী বছরগুলোতে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে পাওয়ার গ্রিডের আয়ও ধারাবাহিকভাবে বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এই সম্ভাবনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করবে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি, শিল্প কার্যক্রমের গতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর।
একদিকে বিদ্যুতের খুচরা ও পাইকারি দাম বৃদ্ধি নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে, অন্যদিকে সঞ্চালন মাশুল বাড়ার ফলে জাতীয় গ্রিড পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পাওয়ার গ্রিডের দাবি অনুযায়ী, নতুন হার পুরোপুরি কার্যকর থাকলে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আয় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফলে বিদ্যুৎ খাতের এই সিদ্ধান্ত শুধু জ্বালানি খাতেই নয়, পুঁজিবাজারেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

