বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ‘স্মার্ট পোর্ট’-এ রূপান্তরের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত, নিরাপদ ও দক্ষ বন্দর পরিচালনার উদ্দেশ্যে পরীক্ষামূলকভাবে একটি নিজস্ব ৫জি নেটওয়ার্ক চালুর অনুমতি পেয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে তিন মাসের জন্য ৩ দশমিক ৫ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের ২০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। পরীক্ষামূলক এই কার্যক্রম চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে বন্দরে একটি ব্যক্তিগত বা প্রাইভেট ৫জি নেটওয়ার্ক স্থাপন করে এর কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। দেশের অবকাঠামো খাতে এ ধরনের প্রযুক্তি পরীক্ষার এটি অন্যতম বড় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বর্তমান বিশ্বে বন্দর ব্যবস্থাপনা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশ্বের বড় বড় সমুদ্রবন্দর এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং উচ্চগতির যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম বন্দরও সেই পথেই হাঁটতে চায়। নতুন ৫জি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দূরনিয়ন্ত্রিত ক্রেন পরিচালনা, স্বয়ংক্রিয় কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, বাস্তবসময়ে পণ্য পরিবহন পর্যবেক্ষণ এবং ইন্টারনেট অব থিংসভিত্তিক লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা চালুর সুযোগ তৈরি হবে। ফলে বন্দরে পণ্য ওঠানামার গতি বাড়বে, সময় কম লাগবে এবং পরিচালন ব্যয়ও কমে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্দরের মতো একটি ব্যস্ত ও কৌশলগত স্থানে যোগাযোগ ব্যবস্থার নিরবচ্ছিন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অনেক কার্যক্রম প্রচলিত যোগাযোগ অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হলেও ভবিষ্যতে একটি নিজস্ব সুরক্ষিত নেটওয়ার্ক বন্দরের নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষাকে আরও শক্তিশালী করবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ৫জি ও দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তন প্রযুক্তিনির্ভর একটি এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও করেছে। এর ফলে তথ্য আদান-প্রদানে নিরাপত্তা বাড়বে এবং গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে প্রযুক্তিগত ঝুঁকি কমবে।
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশ ইতোমধ্যেই বন্দর ও শিল্প খাতে ব্যক্তিগত ৫জি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং সুইজারল্যান্ডের মতো দেশগুলো স্মার্ট বন্দর, বিমানবন্দর, শিল্পকারখানা ও লজিস্টিকস কেন্দ্র পরিচালনায় এই প্রযুক্তি কাজে লাগাচ্ছে। বিশেষ করে জার্মানি শিল্প খাতের জন্য আলাদা স্পেকট্রাম সংরক্ষণ করে বেসরকারি ৫জি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি সফল মডেল তৈরি করেছে। সেই অভিজ্ঞতাই এখন বাংলাদেশের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠছে।
পরীক্ষামূলক এই প্রকল্পের পুরো সময়জুড়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রযুক্তিবিদরা নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা ও স্পেকট্রামের ব্যবহার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। নির্ধারিত সময় শেষে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে স্থায়ীভাবে নিজস্ব ৫জি নেটওয়ার্ক পরিচালনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ উদ্যোগ শুধু একটি প্রযুক্তিগত পরীক্ষা নয়, বরং বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়নের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। বর্তমানে দেশের আমদানি-রপ্তানির সবচেয়ে বড় অংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই কনটেইনার জট, পণ্য খালাসে বিলম্ব এবং পরিচালনগত সীমাবদ্ধতার মতো নানা সমস্যার কথা উঠে এসেছে। স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এসব সমস্যা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, পরীক্ষামূলক এই ৫জি প্রকল্প সফল হলে চট্টগ্রাম বন্দর শুধু দেশের সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দর হিসেবেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বন্দর হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যক্তিগত ৫জি নেটওয়ার্ক ব্যবহারের পথও খুলে দিতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা, দ্রুততা এবং নিরাপত্তার সমন্বয়ে চট্টগ্রাম বন্দরকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগকে তাই একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলেই মনে করা হচ্ছে।

