দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও অর্থকরী ফল আম। প্রতি বছর গ্রীষ্ম মৌসুমে কোটি কোটি টাকার এই ফল ঘিরে জমে ওঠে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর কাতারে উঠে এলেও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আম এখনও প্রত্যাশিত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার দেশীয় বাজার থাকা সত্ত্বেও রপ্তানি আয় ১০০ কোটি টাকার সীমাও অতিক্রম করতে পারেনি, যা দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য বড় এক বৈপরীত্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রপ্তানি বাড়ানো না গেলে আম খাতের প্রকৃত সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। বর্তমানে উৎপাদন, বাজার ও ভোক্তা চাহিদার বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আম উৎপাদনকারী দেশ হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশের অংশীদারিত্ব অত্যন্ত সীমিত।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে প্রায় ২ লাখ ৭ হাজার হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে এবং উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২৬ লাখ ৬২ হাজার টন। এই বিপুল উৎপাদনের ভিত্তিতে দেশীয় বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। কিন্তু একই সময়ে বিদেশে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ২ হাজার ১৯৪ টন আম। রপ্তানি থেকে অর্জিত আয় দেশের মোট আম অর্থনীতির তুলনায় খুবই নগণ্য।
বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আম উৎপাদনে ভারত বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে। এরপর রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, চীন, মেক্সিকো, ব্রাজিল ও পাকিস্তান। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদক দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। উৎপাদনের সর্বশেষ তথ্য বিবেচনায় দেশের অবস্থান আরও উপরে উঠে আসতে পারে বলে মনে করছেন কৃষি বিশ্লেষকরা।
কিন্তু উৎপাদনে এগিয়ে থাকলেও রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান হতাশাজনক। গত কয়েক বছরে রপ্তানির পরিমাণ আড়াই থেকে তিন হাজার টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। অথচ বিশ্ব আম বাণিজ্যের বাজার এখন কয়েক বিলিয়ন ডলারের। সেখানে বাংলাদেশের অংশ অত্যন্ত সামান্য।
রপ্তানিকারকদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা পেলে বাংলাদেশ থেকে বছরে এক লাখ টনেরও বেশি আম রপ্তানি করা সম্ভব। কারণ দেশের বিভিন্ন জাতের আম আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক মান ও স্বাদের অধিকারী। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আম প্রতিবেশী দেশের আমের তুলনায় বেশি সুস্বাদু বলেও দাবি করেন তারা।
বর্তমানে যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুইডেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের আম যাচ্ছে। সম্প্রতি চীনের বাজারেও প্রবেশ করেছে দেশীয় আম। পাশাপাশি জাপান, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো নতুন বাজার থেকেও আগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তবে সম্ভাবনার বিপরীতে বাস্তবতা অনেক কঠিন। রপ্তানিকারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য শুধু ভালো স্বাদের আম যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নির্দিষ্ট মান বজায় রেখে নিয়মিত সরবরাহ। সেই জায়গাতেই পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে উত্তম কৃষি চর্চা, চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের ক্ষেত্রে এখনও বড় ঘাটতি রয়েছে।
এছাড়া উৎপাদক, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কোয়ারেন্টাইন কর্তৃপক্ষ এবং রপ্তানিকারকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও রপ্তানি বৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ফল বাছাই, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং এবং মান নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক প্যাক হাউস, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার এবং উন্নত গ্রেডিং ব্যবস্থার অভাব রপ্তানি সক্ষমতাকে সীমিত করে রেখেছে। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ছে।
তবে সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে উঠে এসেছে বিমান পরিবহন ব্যয়। বর্তমানে বিদেশে আম পাঠাতে প্রতি কেজিতে পাঁচশ টাকারও বেশি বিমান ভাড়া গুনতে হচ্ছে। উৎপাদন, সংগ্রহ, বাছাই, প্যাকেজিং এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যয় যুক্ত করলে এক কেজি আম বিদেশে পাঠানোর মোট খরচ প্রায় সাতশ টাকায় পৌঁছে যায়।
রপ্তানিকারকদের দাবি, কয়েক বছর আগেও এই খরচ অনেক কম ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিমান ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আম প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। একই ধরনের আম তুলনামূলক কম খরচে ভারত ও পাকিস্তান থেকে রপ্তানি হওয়ায় বিদেশি ক্রেতারা অনেক ক্ষেত্রে সেদিকেই ঝুঁকছেন।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে উৎপাদনের চেয়ে পরিবহন ব্যয়ই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশি বাজারে লাভজনক দামে আম বিক্রি সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সম্ভাব্য রপ্তানির বড় অংশ বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
বিষয়টি সরকারের নজরেও এসেছে। কৃষিমন্ত্রী সম্প্রতি স্বীকার করেছেন যে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কার্গো ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি। তিনি এ সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে কার্গো পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও জানিয়েছেন।
এদিকে কৃষি অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প কয়েক বছর ধরে মানসম্পন্ন আম উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রকল্পের আওতায় উন্নত কৃষি ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ উৎপাদন, আধুনিক সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থার প্রসার ঘটানো হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য উপযোগী আম উৎপাদন ধীরে ধীরে বাড়ছে।
চলতি মৌসুমে উৎপাদন ভালো হওয়ায় কৃষকরা আশাবাদী। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা নেই। তবে রপ্তানি প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়লে অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে স্থানীয় বাজারে দাম কমে যেতে পারে, যা কৃষকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আম শুধু একটি ফল নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক রপ্তানি অর্থনীতির সম্ভাবনাময় খাত। তৈরি পোশাকের বাইরে কৃষিপণ্যের রপ্তানি বৈচিত্র্য আনতে আম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং রপ্তানি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, পরিবহন ব্যয় হ্রাস, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতকরণ এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আম উৎপাদনকারী দেশ হয়েও রপ্তানিতে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদনের সাফল্যকে বৈদেশিক আয় বৃদ্ধিতে রূপান্তর করা। প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে কয়েক বছরের মধ্যেই দেশের আম আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

