ভারত সরকারের এক বছর আগে আরোপ করা বিধিনিষেধের প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে। শুরুতে বড় ধরনের ধাক্কা না লাগলেও ধীরে ধীরে দেশটিতে বাংলাদেশের পণ্যের রপ্তানি কমে যাচ্ছে।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই–এপ্রিল) ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ কমেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো–এর তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে বাংলাদেশ ভারতে রপ্তানি করেছে ১৪৬ কোটি ৫৮ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য। আগের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি ছিল ১৫২ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের। সে হিসাবে রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ৪২ শতাংশ।
এই সময়ে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়াবিহীন জুতা এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে। তবে প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি সামান্য বেড়েছে।
রপ্তানিকারকদের মতে, বিধিনিষেধের কারণে ভারতে পণ্য পাঠানোর খরচ বেড়ে গেছে। এতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে গেছে এবং রপ্তানিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁদের মতে, সরকার যদি আলোচনার মাধ্যমে বিধিনিষেধ শিথিলের উদ্যোগ নেয়, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। সাবেক কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খান বলেন, আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট সমাধান সম্ভব এবং বিষয়টি খুব জটিল নয়।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন–এর সাবেক এই সদস্য মনে করেন, দুই দেশের বাণিজ্যিক টানাপোড়েন মূলত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে তৈরি হয়েছে। করোনার পর ২০২১–২২ অর্থবছরে ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশ ১৯৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল। এরপর দুই বছর টানা পতন দেখা যায়। তবে গত অর্থবছরে ভারত ছিল বাংলাদেশের অষ্টম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। ওই সময়ে রপ্তানি দাঁড়ায় ১৭৬ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি।
গত এপ্রিলে বাংলাদেশ সরকার স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয়। এর পরপরই ভারত তিন দফায় বিভিন্ন পণ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করে। গত বছরের ১৭ মে ও ২৭ জুন পোশাক, খাদ্যপণ্য, পাটপণ্য, তুলা–সুতার বর্জ্য, প্লাস্টিক পণ্য ও কাঠের আসবাব রপ্তানিতে সীমাবদ্ধতা আসে। পরে ১১ আগস্ট আরও কিছু পাটপণ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পাশাপাশি পাটপণ্যের ওপর প্রতিকারমূলক শুল্ক আরোপের বিষয়ে তদন্তও শুরু করে ভারত।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে পাট ও পোশাকপণ্য এখন স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে রপ্তানি করা যাবে না। এসব পণ্য কেবল মুম্বাইয়ের নভোসেবা বন্দর দিয়ে পাঠাতে হবে। অন্যদিকে খাদ্যপণ্য, কোমল পানীয়, কাঠের আসবাব, তুলা–সুতার বর্জ্য এবং প্লাস্টিক পণ্য নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থলবন্দর ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ সংযুক্ত স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানি করা যাবে না।
তৈরি পোশাক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত ভারতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এ খাতে রপ্তানি হয়েছে ৫০ কোটি ডলারের পণ্য, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি–এর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ভারতের বাজার খুব বড়। এটি হারানো কোনোভাবেই সুবিধাজনক নয়। বিধিনিষেধ শিথিল করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। ভারতের দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানি খাত কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এ খাতে রপ্তানি হয়েছে ১৮ কোটি ৮ লাখ ডলারের পণ্য, যা আগের বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৬৬ শতাংশ কম। তৃতীয় বৃহৎ খাত কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য। এ খাতে রপ্তানি হয়েছে ১১ কোটি ডলারের পণ্য, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ প্রায় ২৪ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন–এর চেয়ারম্যান তাপস প্রামাণিক বলেন, পাটপণ্যের অন্যতম বড় বাজার ভারত। এই বাজারকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাই আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ–এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ভারত এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তাদের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও আলোচনা চলছে। ফলে ভবিষ্যতে দেশটির বাণিজ্য আরও বাড়বে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ থাকলেও সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা হলে দ্রুত সমাধানের পথ বের হতে পারে।

