যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আওতায় রাজস্ব বৃদ্ধি ও রপ্তানি সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করেন। এসব শুল্কের হার কোথাও ১০ শতাংশ থেকে শুরু করে ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিভিন্ন সময় নিজের সিদ্ধান্তে এসব শুল্ক কমানো–বাড়ানো করেন। কোনো দেশ তাঁর প্রস্তাবিত শুল্ক ব্যবস্থায় অনুকূল সাড়া না দিলে শুল্ক আরও বাড়িয়ে দেওয়ার নজিরও দেখা যায়। এক পর্যায়ে চীনের রপ্তানির ওপর ১৪৫ শতাংশ এবং ভারতের রপ্তানির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা আসে। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রায় ৬০টি দেশের ওপর এ ধরনের শুল্ক নীতির প্রভাব পড়ে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ অতিরিক্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়। পরে আলোচনা শেষে তা কমিয়ে ২০ শতাংশে নামানো হয়।
বাংলাদেশ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮ দশমিক ২ থেকে ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, যা একক দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ রপ্তানি বাজার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে আমদানি প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র বছরে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের সেবা রপ্তানি করে বাংলাদেশে এবং দেশটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের আহ্বান জানালে বাংলাদেশসহ মোট ৯টি দেশ পৃথকভাবে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, আর্জেন্টিনা, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া, ইকুয়েডর, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। চুক্তির ফলে শুল্ক আরও ১ শতাংশ কমে ১৯ শতাংশে নেমে আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই চুক্তি স্বাক্ষর হয় জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে। চুক্তি প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে অংশ নেন অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন, বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এবং ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিনিধিরা।
অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে চুক্তিটি সম্পন্ন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ড. খলিলুর রহমান পরে জানান, চুক্তির আগে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছিল। তবে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে এমন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি কেন স্বাক্ষর করা হলো এবং কেন তা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করা হলো না।
চুক্তিতে ৬০ দিনের নোটিশে বাতিলের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে এটি একটি শক্তিশালী দেশের সঙ্গে কার্যকরভাবে বাতিল করা কঠিন হতে পারে বলে মত বিশ্লেষকদের। তাদের মতে, এতে ভবিষ্যৎ সরকারের ওপর বাস্তবায়নের চাপ তৈরি হতে পারে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য আমদানি করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে বছরে ৭ লাখ মেট্রিক টন গম, ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের সয়াবিন, ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের তুলা, ১৪টি বোয়িং বিমান এবং ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস।
অন্যদিকে বাংলাদেশ এতদিন তুলা, সয়াবিন, গম ও জ্বালানি পণ্য তুলনামূলক কম দামে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আমদানি করে আসছিল। নতুন চুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসব পণ্য তুলনামূলক বেশি দামে কিনতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাক্ষরিত ৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের চুক্তি সবচেয়ে কঠোর এবং বাধ্যতামূলক শর্তযুক্ত। এতে শুধু শুল্ক নয়, দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য কাঠামো পরিবর্তনের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।
চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে শুল্ক ছাড় দিলে অন্য দেশগুলোকেও একই সুবিধা দিতে হতে পারে, যা সর্বাধিক অনুকূল দেশের নীতির কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য ও প্রাণিসম্পদ পণ্য আমদানি করতে হতে পারে। একইভাবে জ্বালানি নিরাপত্তার অজুহাতে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি বাড়তে পারে।
চুক্তির অংশ হিসেবে অতিরিক্ত ১৪টি বোয়িং বিমান কেনার বাধ্যবাধকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, কারণ এগুলোর পরিচালনা ও সংরক্ষণের সক্ষমতা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এসব শর্ত বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং নীতি স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিও মূলত প্রতিযোগিতামূলক দামে পরিচালিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে পণ্য কেনে, যা কোনো ধরনের অনুগ্রহ নয়। অন্যদিকে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা বলা হয়েছে, যেখানে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা রয়েছে।
চুক্তির বিভিন্ন শর্ত সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মত বিশ্লেষকদের। তাদের মতে, কোনো জবাবদিহিমূলক সরকার জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করে এমন চুক্তি স্বাক্ষর করবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানে চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়নি। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এটি কার্যকর হওয়ার কথা। তবে বাস্তবে গম, জ্বালানি ও বিমান সংক্রান্ত কিছু চুক্তি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
এ অবস্থায় চুক্তি বাতিলের সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন করা হলে উভয় দেশের জন্য অধিক গ্রহণযোগ্য সমাধান বের হতে পারে।

