দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর ফলে সীমিত আয়ের মানুষ, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর দৈনন্দিন ব্যয় আরও বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ।
রোববার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে মে মাসের মূল্যস্ফীতির এ চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর এটিই সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির হার। একই সঙ্গে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, গত এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেলের বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মে মাসে পুরোপুরি বাজারে প্রতিফলিত হয়েছে। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে উৎপাদন থেকে শুরু করে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ গিয়ে পড়েছে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
সরকার গত ১৯ এপ্রিল ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করে। এর ফলে কৃষি, শিল্প, পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় একযোগে বেড়ে যায়। যদিও ৩১ মে আরও এক দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে, তার প্রভাব মে মাসের মূল্যস্ফীতির হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে জুন মাসে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকেরা।
এরই মধ্যে বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় এবং সেবা খাতের খরচ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ শুধু খাদ্য নয়, বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা, পোশাক এবং অন্যান্য সেবার খরচও দ্রুত বাড়ছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে শাকসবজি, মাছ, মাংস, ডিম ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী। চালের বাজারেও চাপ দেখা গেছে। বিভিন্ন ধরনের চালের দাম কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর। কারণ আয় স্থির থাকলেও ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকে। এতে পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় খরচ কমানো, সঞ্চয় ভাঙানো কিংবা ঋণের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়।
মে মাসে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের আয় যে হারে বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় তার চেয়ে দ্রুত বেড়েছে। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে প্রকৃত আয় হ্রাস পাওয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি যখন মজুরি বা আয় বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যায়, তখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। একই আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হয়। ফলে পরিবারগুলোকে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পোশাক কিংবা যাতায়াতের মতো খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হতে হয়।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সাম্প্রতিক প্রভাব পুরোপুরি বাজারে প্রতিফলিত হলে আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নতুন করে বাড়বে এবং অর্থনীতিতে ভোগব্যয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

