বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে চিংড়ি রপ্তানি আয় ৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা, উন্নত জলচাষ প্রযুক্তি এবং পৃথক চিংড়ি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলে একসময় দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানি খাতকে আবারও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নব্বইয়ের দশকে যেখানে এই খাতের আয় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ছিল, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের নিচে। এই ধারাবাহিক পতন খাতটিকে পুনর্গঠনের জরুরি প্রয়োজনকে সামনে এনেছে। একসময় ‘হোয়াইট গোল্ড’ নামে পরিচিত এই খাত দীর্ঘদিন ধরেই সংকটে রয়েছে।
সম্প্রতি মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ একটি কৌশলপত্র উপস্থাপন করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ, সমন্বিত বিনিয়োগ এবং আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুললে খাতটি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। চিংড়ি খাত বর্তমানে তিন লাখের বেশি প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং ৬০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। দেশে প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হয়, যা বৈশ্বিকভাবে পঞ্চম বৃহৎ চাষ এলাকা হিসেবে বিবেচিত।
পতন ও সংকটের পেছনের কারণ:
২০০৬ সালের পর থেকেই এই খাতের পতন শুরু হয়। পরিবেশগত অবনতি, নগরায়নের কারণে জলাশয় সংকোচন, অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং উচ্চ ফলনশীল ভ্যানামি চিংড়ি চাষে দেরি—সব মিলিয়ে উৎপাদন কমে যায়।
২০১৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪৪৮ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২৯৬ মিলিয়ন ডলারে। একসময় এই খাত থেকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার আয় হতো। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সরবরাহ ঘাটতি, পরিবেশগত অবক্ষয়, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে ব্যর্থতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধিই প্রধান সমস্যা।
মহেশখালী কর্তৃপক্ষের মতে, চীন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মতো দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে খাতকে আধুনিক করতে হবে। প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে ঘন ও নিয়ন্ত্রিত চাষাবাদ ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় চিংড়ি অর্থনৈতিক অঞ্চলের আওতায় হ্যাচারি, খাদ্য উৎপাদন কেন্দ্র, পরীক্ষাগার, খামার, সংরক্ষণাগার এবং লজিস্টিক অবকাঠামো একসঙ্গে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া পুনঃসঞ্চালন জলচাষ ব্যবস্থা এবং বায়োফ্লক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে বাচ্চা চিংড়ির বেঁচে থাকার হার ৮৫ শতাংশের বেশি হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি হেক্টরে গড় উৎপাদন মাত্র ৪০০ কেজি। অন্যদিকে ইকুয়েডরে একই পরিমাণ জমিতে প্রায় ৬৮০০ কেজি, ভারতে ৫৫০০ কেজি এবং ভিয়েতনামে ৪৫০০ কেজি উৎপাদন হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বেশিরভাগ খামার এখনো পুরোনো পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। এতে উৎপাদন কম এবং আন্তর্জাতিক মান পূরণেও সমস্যা হচ্ছে। বিশ্ববাজারে ভ্যানামি চিংড়ির চাহিদা ৮০ শতাংশের বেশি। এটি বেশি উৎপাদনক্ষম এবং কম খরচে উৎপাদন সম্ভব।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, উচ্চ দামের খাদ্য, বিদ্যুৎ ব্যয়, মানসম্মত চিংড়ির বাচ্চার ঘাটতি এবং দুর্বল অবকাঠামো উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করছে। অনেক সময় দেশীয় বাজারে কাঁচামালের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বেশি পড়ে যায়, ফলে রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমে যায়।
এছাড়া অগভীর পুকুর, দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থা এবং খাদ্য উপকরণের আমদানিনির্ভরতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম থেকে খুলনা পর্যন্ত দীর্ঘ পরিবহন সময়ের কারণে চিংড়ির বাচ্চার মৃত্যুহার বেড়ে যায়।
বিশ্ব চিংড়ি বাজার বর্তমানে প্রায় ৭৪.৭ বিলিয়ন ডলারের, যা ২০৩১ সালের মধ্যে ১০৬.১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। নীতিনির্ধারকরা বলছেন, খাতটি আধুনিক করা গেলে রপ্তানি আয় ২ থেকে আড়াই বিলিয়ন ডলারের মধ্যে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, এমনকি আরও বাড়ানোও সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রযুক্তি, ব্র্যান্ডিং এবং মূল্য সংযোজন ছাড়া এই খাতের পুনরুদ্ধার কঠিন হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে চিংড়ি আবারও বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

