বাংলাদেশের আম রপ্তানি খাতে দীর্ঘদিনের একটি বড় বাধা দূর হওয়ার পথে। অত্যাধুনিক ‘ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট’ (ভিএইচটি) প্রযুক্তি চালুর মাধ্যমে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো উচ্চমূল্যের বাজারে বাংলাদেশের আম প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কঠোর কোয়ারেন্টিন বিধিনিষেধের কারণে এতদিন এসব বাজার কার্যত দেশের আমের জন্য বন্ধ ছিল।
বিশ্বের শীর্ষ আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। প্রতিবছর দেশে প্রায় ২৫ লাখ টন আম উৎপাদিত হলেও রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে খুবই কম। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ১০০ টন। উৎপাদন ও রপ্তানির এই বিশাল ব্যবধানের মূল কারণ ছিল আন্তর্জাতিক মান ও আমদানিকারক দেশের স্বাস্থ্যবিধি পূরণে সীমাবদ্ধতা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন প্রযুক্তি সেই সংকট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ এনে দিতে পারে।
ঢাকার গাবতলীতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন) পরিচালনায় স্থাপিত আধুনিক ভিএইচটি প্ল্যান্ট চলতি মৌসুমে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রতিদিন প্রায় ১২ টন আম প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে এ কেন্দ্রে। এর সঙ্গে যুক্ত প্যাকেজিং সুবিধাও ইতোমধ্যে চালু হয়েছে, যা রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
ভিএইচটি প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই ফলের ভেতরে থাকা ক্ষতিকর পোকামাকড়, ডিম ও লার্ভা ধ্বংস করা। নির্দিষ্ট তাপমাত্রার বাষ্পীয় তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এতে আমের স্বাদ, গন্ধ, রং ও পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ন থাকে। একই সঙ্গে ফলের সংরক্ষণকালও বাড়ে, যা দূরবর্তী দেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রযুক্তিটি ধোয়া, বাছাই এবং শীতলীকরণের কাজও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য শুধু উন্নতমানের ফল উৎপাদন করলেই হয় না; আমদানিকারক দেশের কোয়ারেন্টিন শর্তও কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। বিশেষ করে জাপান আম আমদানির ক্ষেত্রে ভিএইচটি বাধ্যতামূলক করেছে। ফলে এই প্রযুক্তি ছাড়া ওই বাজারে প্রবেশ কার্যত অসম্ভব।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, প্রযুক্তি স্থাপন করাই শেষ কথা নয়। জাপানসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর স্বীকৃতি বা অ্যাক্রেডিটেশন অর্জন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমদানিকারক দেশকে নিশ্চিত হতে হবে যে বাংলাদেশের ভিএইচটি ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কাজ করছে এবং তাদের নির্ধারিত সব শর্ত পূরণ করছে। আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া নতুন প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও রপ্তানির পথ পুরোপুরি খুলবে না।
রপ্তানিকারকদের মধ্যেও এ বিষয়ে কিছুটা হতাশা রয়েছে। তাদের মতে, ভিএইচটি প্ল্যান্ট চালু হলেও এখনও অনেক দেশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি উপস্থাপন ও নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। ফলে কাঙ্ক্ষিত বাজারে দ্রুত প্রবেশের সুযোগ আপাতত সীমিত রয়েছে। তারা মনে করেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে দ্রুত কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ নিতে হবে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমদানিকারক দেশগুলো যখন নিশ্চিত হবে যে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো আম আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ভিএইচটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে, তখন বাজার সম্প্রসারণ অনেক সহজ হবে। বিশেষ করে জাপান বাংলাদেশের আমের প্রতি আগ্রহ দেখালেও কোয়ারেন্টিন নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
রপ্তানিকারকদের জন্য ইতিবাচক খবর হলো, সরকার প্রাথমিকভাবে প্রতি কেজি আমে ভিএইচটি সেবার খরচ মাত্র তিন টাকা নির্ধারণ করেছে। ব্যবসায়ীরা এটিকে তুলনামূলকভাবে সহনীয় ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যয় হিসেবে দেখছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশ ৩৮টি দেশে ২ হাজার ১৯৪ টন আম রপ্তানি করেছে। চলতি মৌসুমে এ পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার টনে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া ও জাপানের মতো নতুন বাজার যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে আম উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে ২৫ লাখ টনের বেশি থাকলেও রপ্তানির চিত্র স্থিতিশীল নয়। কোনো বছর কয়েকশ টন, আবার কোনো বছর এক হাজার টনের কিছু বেশি রপ্তানি হয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদনের তুলনায় বৈদেশিক বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি এখনও খুবই সীমিত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু ভিএইচটি প্রযুক্তি চালু করলেই হবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নিশ্চিত করতে হলে ভালো কৃষি চর্চা, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, ফল ব্যাগিংয়ের বিস্তার, নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহার এবং কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এতে বিদেশি ক্রেতারা সহজেই পণ্যের উৎস ও উৎপাদন প্রক্রিয়া যাচাই করতে পারবেন।
বর্তমানে থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম ও ভারত বহু বছর ধরে ভিএইচটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে সফলভাবে আম রপ্তানি করছে। বাংলাদেশও এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো। সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন এবং মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে দেশের আম রপ্তানি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। এতে একদিকে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

