বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক পোশাক বাজার যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নতুন করে চাপের ইঙ্গিত মিলেছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দেশটি থেকে বাংলাদেশের পোশাক আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। একই সময়ে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার বার্তা দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অধীন অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির মূল্য ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ কমেছে। এক বছর আগে একই সময়ে যেখানে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৯৮ কোটি ডলার, সেখানে চলতি বছরে তা নেমে এসেছে প্রায় ২৬৫ কোটি ডলারে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমেছে ৩৩ কোটিরও বেশি ডলার।
যদিও বাংলাদেশের রপ্তানিতে পতন ঘটেছে, তবে প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকটি দেশ একই সময়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী দেশ ভিয়েতনাম আমদানি আয় বাড়িয়েছে। একইভাবে কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়াও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে কম্বোডিয়ার প্রবৃদ্ধির হার দুই অঙ্কে পৌঁছানো আন্তর্জাতিক বাজারে দেশটির ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ইঙ্গিত বহন করে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ক্রেতাদের ব্যয় সংকোচন, মূল্য প্রতিযোগিতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তন বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে ক্রেতারা এখন আরও বেশি দামে নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে পণ্য সংগ্রহে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি খরচ ও লজিস্টিক ব্যয়ের চাপ বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তবে বাংলাদেশের তুলনায় আরও বড় ধাক্কা খেয়েছে চীন ও ভারত। যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পোশাক রপ্তানি অর্ধেকেরও বেশি কমেছে। ভারতও উল্লেখযোগ্য হারে বাজার হারিয়েছে। ফলে রপ্তানি কমলেও বাংলাদেশ এখনও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী দেশের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। প্রথম অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম।
এপ্রিল মাসের তথ্যও বাংলাদেশের জন্য আশাব্যঞ্জক নয়। ওই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৭ শতাংশের বেশি কমেছে। যদিও একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানিও কমেছে, তবুও বাংলাদেশের পতনের হার বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বেশি হওয়ায় বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইউনিট মূল্য বা প্রতি বর্গমিটার সমতুল্যে পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্যও কমেছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশের গড় ইউনিট মূল্য দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৯৭ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় কম। অর্থাৎ শুধু রপ্তানির পরিমাণ নয়, প্রতি ইউনিট পণ্যের মূল্য থেকেও কম আয় হচ্ছে। এতে রপ্তানি আয়ের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে মূল্য প্রতিযোগিতার দিক থেকে বাংলাদেশ এখনও তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে কেবল কম্বোডিয়ার ইউনিট মূল্য বাংলাদেশের চেয়ে কিছুটা কম। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার গড় মূল্য বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। এটি প্রমাণ করে যে কম মূল্যে বৃহৎ পরিমাণে উৎপাদনের সক্ষমতা এখনও বাংলাদেশের অন্যতম শক্তি।
পরিমাণগত হিসাবেও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক সরবরাহ কমেছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো পোশাকের মোট পরিমাণ প্রায় ৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিপরীতে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়া তাদের রপ্তানি পরিমাণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। এর অর্থ হলো বাজার সংকুচিত হলেও এসব দেশ প্রতিযোগীদের কাছ থেকে বাজার অংশীদারিত্ব দখল করতে পেরেছে।
বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানিও এ বছর কমেছে। অর্থমূল্য ও পরিমাণ—উভয় ক্ষেত্রেই দুই অঙ্কের পতন দেখা গেছে। ফলে এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; বরং বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্য বর্তমানে চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে এই সংকটের মধ্যেও যেসব দেশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারছে, তারা ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতায় বাড়তি সুবিধা পেতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে মনোযোগ দেওয়া এবং নতুন প্রযুক্তি ও টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানো। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান বাজারে ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে সরবরাহ সক্ষমতা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো ডেলিভারি নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক বাজারের বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতায় শুধু কম খরচে উৎপাদন করলেই হবে না। বরং মূল্য সংযোজন, উদ্ভাবন এবং টেকসই উৎপাদনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় বাজারগুলোতে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব আরও চাপে পড়তে পারে।

