দীর্ঘ বিতর্ক, সমালোচনা ও নীতিগত মতবিরোধের মধ্যেই আবারও অপ্রদর্শিত অর্থ বা কথিত কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দিতে যাচ্ছে সরকার। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আবাসন খাতকে কেন্দ্র করে এমন একটি বিধান অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হচ্ছে, যার আওতায় জমি, ফ্ল্যাট বা ভবন কেনাবেচায় প্রকৃত লেনদেনমূল্য দলিলে উল্লেখিত মূল্যের চেয়ে বেশি হলে সেই অতিরিক্ত অর্থ নিয়মিত কর পরিশোধের মাধ্যমে বৈধ করা যাবে। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে কর পরিশোধ করলে ওই অর্থের উৎস নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন অর্থবিলে এ সংক্রান্ত একটি পৃথক ধারা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, স্থাবর সম্পত্তি কেনাবেচার ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্য এবং দলিলমূল্যের মধ্যে পার্থক্য থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি স্বেচ্ছায় তা ঘোষণা করে প্রযোজ্য আয়কর পরিশোধ করতে পারবেন। এর ফলে আগে অপ্রদর্শিত থাকা অর্থ বৈধ হিসেবে গণ্য হবে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। অর্থাৎ সম্পত্তি হস্তান্তরের সঙ্গে জড়িত দুই পক্ষের কেউ যদি প্রকৃত লেনদেনমূল্য গোপন করে থাকেন, তাহলে পরবর্তীতে কর পরিশোধের মাধ্যমে সেই অর্থ নিয়মিত করার সুযোগ পাবেন।
খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, কেউ যদি স্বপ্রণোদিত হয়ে কর পরিশোধ করেন, তাহলে ওই অর্থের উৎস, আয় বা লেনদেন সম্পর্কে কোনো ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন বা তদন্তমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না। তবে যেসব ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে তদন্ত, নিরীক্ষা বা আইনগত কার্যক্রম শুরু হয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়মিত করের পাশাপাশি অতিরিক্ত ২০ শতাংশ কর দিতে হবে।
তবে আদালতের মাধ্যমে আগে থেকেই দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিরা এই সুবিধার আওতায় আসতে পারবেন না। ফলে সরকারের প্রস্তাবিত কাঠামোতে কিছু সীমাবদ্ধতা ও শর্তও রাখা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের আবাসন খাতে দীর্ঘদিন ধরেই দলিলমূল্য ও প্রকৃত বাজারমূল্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের সময় প্রকৃত লেনদেনমূল্যের একটি অংশ আনুষ্ঠানিকভাবে দেখানো হয় না। ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ কর ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়। সরকার সেই অর্থকে করের আওতায় আনতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে বিপুল পরিমাণ অর্থ অলস অবস্থায় পড়ে আছে অথবা অনানুষ্ঠানিক খাতে ঘুরছে। এসব অর্থ যদি আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ পায়, তাহলে নির্মাণশিল্প, সিমেন্ট, রড, সিরামিক, পরিবহন, প্রকৌশল সেবা এবং অন্যান্য সহায়ক শিল্পে নতুন গতি তৈরি হবে।
রিয়েল এস্টেট খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ সুদহার, মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার কারণে আবাসন খাত কিছুটা স্থবিরতার মুখে পড়েছে। অপ্রদর্শিত অর্থকে কর দিয়ে বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হলে বাজারে নতুন বিনিয়োগ প্রবাহ তৈরি হতে পারে, যা কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে সহায়ক হবে।
তবে এই প্রস্তাব নিয়ে তীব্র আপত্তিও রয়েছে। দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ও সুশাসনকর্মীরা মনে করেন, কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ মূলত সৎ করদাতাদের প্রতি অবিচার এবং কর ফাঁকিদাতাদের জন্য পুরস্কারস্বরূপ। তাদের যুক্তি, যারা নিয়মিত কর দিয়েছেন, তাদের তুলনায় কর ফাঁকি দিয়ে পরে বিশেষ সুবিধা নেওয়ার সুযোগ ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
সুশাসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সুযোগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করে। কারণ এতে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থও শেষ পর্যন্ত আইনি সুরক্ষা পেতে পারে। তারা মনে করেন, এটি দীর্ঘমেয়াদে কর সংস্কৃতি ও জবাবদিহির জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে।
অন্যদিকে কিছু অর্থনীতিবিদ মধ্যপন্থার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের মতে, দুর্নীতি, ঘুষ, অর্থপাচার বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত অর্থকে কোনো অবস্থাতেই বৈধ করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। তবে যেসব অর্থ বৈধভাবে উপার্জিত হলেও বিভিন্ন কারণে আয়কর বিবরণীতে দেখানো হয়নি, সেগুলোকে অতিরিক্ত কর ও জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে বৈধ করার ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, আবাসন খাতে কালো টাকার অন্যতম কারণ হলো সরকারি নির্ধারিত মূল্য ও প্রকৃত বাজারমূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান। এই ব্যবধান কমিয়ে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ করা গেলে সম্পত্তি লেনদেনে অর্থ গোপনের প্রবণতা অনেকাংশে হ্রাস পেতে পারে। একই সঙ্গে করহার যৌক্তিক করা, কর প্রশাসন সহজ করা এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করাই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান হতে পারে।
বাংলাদেশে অতীতেও একাধিকবার কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। কেউ মনে করেন এতে অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ আসে, আবার কেউ বলেন এটি কর ন্যায্যতা ও সুশাসনের জন্য ক্ষতিকর।
এবারের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে আবাসন খাত নতুন বিনিয়োগের সুযোগ পেতে পারে, তবে একই সঙ্গে করনীতি, নৈতিকতা এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে নতুন বিতর্কও সামনে আসতে পারে। তাই বাজেট ঘোষণার পর এই প্রস্তাব অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণী মহলে অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

