দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান স্থায়ী সমাধান নয় বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতির প্রকৃত সমাধান নিহিত রয়েছে বাজার ব্যবস্থার সংস্কার, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় হ্রাস, সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অর্থনীতির মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানের মধ্যে।
রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাত, সরকারি কর্মচারীদের বেতন, কালো টাকা, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, আন্তর্জাতিক কারণও বড় ভূমিকা রাখছে। বৈশ্বিক সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি খাতের অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তবে দেশের ভেতরে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো গেলে মূল্যস্ফীতির চাপ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
তিনি জানান, বর্তমানে একটি ব্যবসা শুরু করা থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, উচ্চ সুদের ঋণ, বন্দরে অতিরিক্ত ব্যয় এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এসব ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
অর্থমন্ত্রীর মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাতে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। খাদ্য, জ্বালানি ও সারের মতো কৌশলগত পণ্যের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করাও জরুরি।
তিনি বলেন, অতীতে অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারের তাৎক্ষণিক ক্রয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, যা ব্যয় বাড়িয়েছে। ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি, উন্নত গুদাম ব্যবস্থা এবং কার্যকর সংরক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো নিয়েও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় এক যুগ ধরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের সমন্বয় হয়নি। এ সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ফলে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন পুনর্নির্ধারণ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
তাঁর মতে, পর্যাপ্ত আয় নিশ্চিত হলে অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রবণতা কমে আসে। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে সংকট থাকলে অনৈতিক পথে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনিক দক্ষতা ও সুশাসনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের অর্থনীতি এখনও একটি কঠিন পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অতীতের বিভিন্ন নীতিগত ভুল, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং অর্থ পাচারের প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও টেকসই অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী দুই বছর কৃচ্ছ্রসাধন ও সংস্কারের সময় হিসেবে বিবেচিত হবে। এরপর ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সূচকে উন্নতি দেখা যেতে পারে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
সংস্কৃতি ও সৃজনশীল অর্থনীতিকে নতুন সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, পূর্বাচলে প্রায় ১৬০ একর জমির ওপর একটি আন্তর্জাতিক মানের ক্রিয়েটিভ সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে থিয়েটার, শিল্পকলা, ডিজাইন, বিনোদন ও সৃজনশীল শিল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে এ প্রকল্পে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
কালো টাকা ও কর ফাঁকি প্রতিরোধে সরকার নতুন উদ্যোগও নিতে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। সারা দেশে মৌজাভিত্তিক ডিজিটাল জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে জমির সরকারি মূল্য ও বাজারমূল্যের মধ্যে থাকা বড় ব্যবধান কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে সম্পত্তি নিবন্ধনে প্রকৃত মূল্য গোপনের সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান খান বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই সম্পত্তি কেনাবেচার সময় প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দেখিয়ে নিবন্ধন করা হয়, যা কর ফাঁকির অন্যতম মাধ্যম। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় এসব তথ্য শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, সমস্যাগ্রস্ত কয়েকটি ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়ানো হলেও আমানতকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
তিনি বলেন, অতীতে ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের ঘটনা ঘটেছে। সেই অর্থ পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। এ লক্ষ্যে একটি বিশেষ টাস্কফোর্সও কাজ করছে।
গভর্নর আরও জানান, আর্থিক লেনদেনকে আরও আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে আগামী মাস থেকে দেশজুড়ে ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধি পাবে এবং নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমবে।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা ঋণখেলাপির অভিযোগ সম্পর্কেও ব্যাখ্যা দেন গভর্নর। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট ঋণ আইন অনুযায়ী পুনঃতফসিল করা হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করছেন। ফলে প্রচলিত ব্যাংকিং বিধি অনুযায়ী তাঁকে ঋণখেলাপি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী এ সংবাদ সম্মেলনে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, উপদেষ্টা, জ্যেষ্ঠ আমলা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা ছিল প্রধান আলোচ্য বিষয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংবাদ সম্মেলনে সরকারের পক্ষ থেকে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে তার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো—স্বল্পমেয়াদি প্রশাসনিক পদক্ষেপের বদলে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া। তবে এসব পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর।

