দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের চলমান স্থবিরতা আরও গভীর আকার ধারণ করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকিং খাতে, যেখানে গ্রামাঞ্চলে ঋণ প্রবাহ ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে এখন নেতিবাচক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য থেকে জানা গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাংক ঋণের স্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের মার্চে গ্রামাঞ্চলে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যা পরবর্তী বছরে কমে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ কয়েক হাজার কোটি টাকার ঋণ সংকোচন ঘটেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এমন সময়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণ কমে যাওয়া বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, যখন একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। সাধারণত প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ গ্রামীণ ভোগ ও বিনিয়োগ বাড়ায়, ফলে ব্যাংক ঋণের চাহিদাও বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে তার বিপরীত চিত্র।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, গ্রামীণ এলাকায় ছোট ও মাঝারি শিল্প, কুটির শিল্প এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার অনেক ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন উদ্যোগও কমে গেছে। ফলে ঋণের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই কমে এসেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর মাঠপর্যায়ে ঋণ বিতরণ সক্ষমতার ঘাটতিও বড় একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের আরেক অংশ মনে করছেন, সমস্যাটি শুধু চাহিদার নয়, সরবরাহ কাঠামোরও। অনেক ব্যাংকেরই গ্রামীণ অর্থনীতিতে কার্যকরভাবে ঋণ পৌঁছানোর পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। এজেন্ট ব্যাংকিং ও উপশাখার মাধ্যমে মূলত আমানত সংগ্রহ হলেও ঋণ বিতরণ সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে গ্রামীণ এলাকায় সংগৃহীত অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতে পূর্ণাঙ্গভাবে ফিরে যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, মোট ব্যাংক ঋণের বড় অংশই শহরকেন্দ্রিক। মোট ঋণের প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি শহরাঞ্চলে বিতরণ করা হলেও গ্রামাঞ্চলের অংশ এখনো তুলনামূলকভাবে অনেক কম। অথচ দেশের জিডিপিতে গ্রামীণ অর্থনীতির অবদান উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া কৃষি খাতেও ঋণ প্রবাহে স্থবিরতা দেখা গেছে। কৃষি ঋণ বিতরণ সাম্প্রতিক সময়ে বাড়ার বদলে কিছুটা কমেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে উঠে এসেছে। ফলে উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের চাপও বাড়ছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, দেশের বেসরকারি খাতে সামগ্রিক ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার কারণে ব্যাংকগুলো নতুন ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হচ্ছে না। অনেক ব্যাংকেরই তারল্য থাকলেও তারা উদ্যোক্তাদের পরিবর্তে সরকারি বন্ড ও নিরাপদ বিনিয়োগে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। এতে করে বেসরকারি ও গ্রামীণ খাতে ঋণ সরবরাহ আরও কমে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, কিছু ব্যাংক প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষুদ্র ঋণ ও ডিজিটাল লোনের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সীমিত পরিসরে সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় খুবই সীমিত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং আস্থার সংকট মিলিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি চাপের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে কর্মসংস্থান কমছে এবং অনেক মানুষ শহরমুখী হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণ প্রবাহ না বাড়লে উৎপাদন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কৃষি খাতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তারা মনে করছেন, ব্যাংকিং নীতিমালা, প্রণোদনা কর্মসূচি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বিত উদ্যোগে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণ প্রবাহ পুনরায় গতিশীল করা সম্ভব হবে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

