বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও টেকসই ব্যবসা এখন আর শুধু একটি প্রবণতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অপরিহার্য শর্তে পরিণত হয়েছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পের সামনে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে উৎপাদন ব্যবস্থা, পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি এবং পরিবেশগত মান নিশ্চিতকরণে দ্রুত অগ্রগতি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের নতুন রপ্তানি সম্ভাবনা: টেকসই প্যাকেজিং শিল্প’ শীর্ষক এক সেমিনারে শিল্প উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক এবং বিশেষজ্ঞরা বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন শুধু পণ্যের গুণগত মান বা মূল্য নয়, পণ্যটি কী ধরনের উপকরণে মোড়ানো হয়েছে এবং সেটি পরিবেশবান্ধব কিনা, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে প্যাকেজিংকে এখন ব্যবসার সহায়ক উপাদান হিসেবে নয়, বরং রপ্তানি সক্ষমতার অন্যতম নির্ধারক হিসেবে দেখতে হবে। কারণ পরিবেশগত মান পূরণে ব্যর্থ হলে অনেক বাজারে প্রবেশের সুযোগই সীমিত হয়ে যেতে পারে।
আলোচনায় উঠে আসে, বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্প গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার বড় অংশ স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে। শিল্পটির বাজারমূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। যদিও বৈশ্বিক প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং বাণিজ্যে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব এখনো খুবই সীমিত।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অর্থবছরে সরাসরি প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং পণ্যের রপ্তানি প্রায় ২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। পাশাপাশি তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আরও প্রায় ৯০ কোটি ডলারের প্যাকেজিং পণ্য বিদেশে গেছে। ফলে খাতটি ইতোমধ্যে রপ্তানি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
তবে সামনে রয়েছে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে কঠোর পরিবেশগত বিধিনিষেধ, পুনর্ব্যবহৃত উপকরণের উৎস শনাক্তকরণে দুর্বলতা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের অতিরিক্ত ব্যয় এবং স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ উল্লেখযোগ্য।
বিশেষ করে ইউরোপীয় বাজারে নতুন নিয়ম চালুর বিষয়টি শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। আগামী ২০৩০ সাল থেকে ইউরোপে বিক্রি হওয়া প্যাকেজিং পণ্যে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহারের প্রমাণ এবং নির্দিষ্ট মাত্রার পুনর্ব্যবহৃত উপাদান নিশ্চিত করতে হবে। এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট পণ্য বাজারে প্রবেশের অনুমতি নাও পেতে পারে।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, বর্তমানে ইউরোপের অনেক ক্রেতা প্যাকেজিং উপকরণে অন্তত ২৫ শতাংশ পুনর্ব্যবহৃত কাঁচামাল ব্যবহারের শর্ত আরোপ করছেন। বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করা হলেও আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা ও গুণগত মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপকরণ উৎপাদনে এখনো ঘাটতি রয়েছে।
তাদের মতে, উন্নত রিসাইক্লিং প্রযুক্তি ছাড়া উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হবে। ফলে আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি গবেষণা ও উদ্ভাবনেও গুরুত্ব দিতে হবে।
নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, টেকসই প্যাকেজিং শিল্প গড়ে তুলতে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। উৎপাদকদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীল করার পাশাপাশি পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহারে উৎসাহ দিতে নীতিগত সহায়তা বাড়ানো জরুরি।
এছাড়া কর কাঠামো সহজীকরণ, প্রযুক্তি আমদানিতে সুবিধা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এ খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে। এতে শুধু রপ্তানি আয়ই বৃদ্ধি পাবে না, কর্মসংস্থানও সম্প্রসারিত হবে।
বিশ্বব্যাপী প্যাকেজিং শিল্পের বাজার বর্তমানে এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। সেই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো সীমিত হলেও সম্ভাবনা ব্যাপক। ইতোমধ্যে দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে বহুজাতিক কোম্পানির জন্য প্যাকেজিং পণ্য সরবরাহ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তৈরি পোশাক খাতের মতো প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পও ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে। তবে এজন্য পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, মানসম্মত পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের সঙ্গে দ্রুত অভিযোজন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বৈশ্বিক বাজারের নতুন বাস্তবতায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
পরিবর্তিত বিশ্ববাণিজ্যের প্রেক্ষাপটে এখনই সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে টেকসই প্যাকেজিং শিল্প বাংলাদেশের জন্য নতুন রপ্তানি দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

