বাংলাদেশে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে গত দুই দশকে বড় পরিবর্তন এসেছে। ভাতের ওপর নির্ভরতা কমে ফল, সবজি, মাছ, মাংস ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু কৃষিখাতে সরকারি ব্যয়ের ধরন এখনো মূলত ধানকেন্দ্রিক রয়ে গেছে। ফলে উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কৃষির বহুমুখীকরণ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংকের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট চাষযোগ্য জমির প্রায় ৭২ শতাংশই ধান চাষের আওতায় রয়েছে এবং কৃষি ভর্তুকির প্রায় ৮০ শতাংশ সুবিধা এই খাতেই কেন্দ্রীভূত। সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। অন্যদিকে প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, ফল, সবজি, বনজ সম্পদ ও কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প—যেগুলো কৃষি খাতের মোট উৎপাদনে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অবদান রাখে—সেগুলো সম্মিলিতভাবে সরকারি সহায়তার ২০ শতাংশেরও কম পাচ্ছে।
রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থায় মানসম্মত প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের জন্য কৃষি খাতে সরকারি ব্যয়ের পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান ব্যয় কাঠামো কৃষিকে বহুমুখী করার পরিবর্তে ধাননির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করছে। অথচ দেশের ভোক্তারা ধীরে ধীরে শস্যভিত্তিক খাদ্য থেকে উচ্চমূল্যের পুষ্টিকর খাদ্যের দিকে ঝুঁকছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কৃষি খাতে সরকারি অর্থের বড় অংশ এখনও সার ভর্তুকি ও ধান উৎপাদন সহায়তায় ব্যয় হচ্ছে। বিপরীতে গবেষণা, উদ্ভাবন, কৃষি সম্প্রসারণ, বাজার সংযোগ, জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি এবং আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়নে তুলনামূলকভাবে অনেক কম বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, কৃষি গবেষণায় মোট ব্যয়ের মাত্র ৪ শতাংশ এবং কৃষি জ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণে ৮ শতাংশ ব্যয় করা হয়। সেচ অবকাঠামোর জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যয় কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও কৃষির আধুনিকায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্বব্যাংকের গবেষকরা বলছেন, বর্তমানে কৃষি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের পরিমাণ নয়, বরং অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে। কৃষি খাতের ৯০ শতাংশেরও বেশি সরকারি সহায়তা ফসল উৎপাদনে ব্যয় হয়, যার বড় অংশ ধানকেন্দ্রিক। ফলে আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, পুষ্টি নিরাপত্তা ও রপ্তানিতে সম্ভাবনাময় অন্যান্য উপখাত প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সার ভর্তুকির সুবিধাও সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। দেশের সবচেয়ে বড় ২০ শতাংশ ভূমির মালিক প্রায় অর্ধেক ভর্তুকি সুবিধা পাচ্ছেন, অথচ নিচের ৪০ শতাংশ কৃষকের অংশ মাত্র ১৫ শতাংশ। কারণ, সার ক্রয়ের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ভর্তুকি সুবিধা নির্ধারিত হওয়ায় বেশি জমির মালিকরাই তুলনামূলক বেশি সুবিধা পান।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ মোট সরকারি ব্যয়ের প্রায় ১০ শতাংশ কৃষি খাতে বরাদ্দ দেয়, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উল্লেখযোগ্য। তবু কৃষি প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার দুর্বল হয়েছে এবং উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের দিকে রূপান্তর প্রত্যাশিত মাত্রায় ঘটেনি।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে কৃষির বহুমুখীকরণ, গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম কৃষি অর্থনীতি গড়ে তোলার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে। এজন্য সার ব্যবহারে মাটির স্বাস্থ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, কৃষক পরামর্শ সেবা সম্প্রসারণ, ডিজিটাল ভর্তুকি ব্যবস্থার বিস্তার এবং দরিদ্র ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ধান উৎপাদনে অর্জিত সাফল্য ধরে রেখেই এখন কৃষি নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে মাছ, মাংস, দুধ, ফল, সবজি এবং কৃষিপ্রক্রিয়াজাত শিল্পকে। অন্যথায় পরিবর্তিত বাজার চাহিদা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় বাংলাদেশের কৃষি খাত কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে পিছিয়ে পড়তে পারে।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উৎপাদন ব্যয় কমানো, মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন, সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পেঁয়াজ, আদা ও পাটবীজের মতো কিছু পণ্যে আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃষির ভবিষ্যৎ শুধু উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, মূল্য সংযোজন, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ এখন সময়ের দাবি।

