দেশে আমদানি পণ্যের মূল্য ঘোষণায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং শুল্ক ফাঁকি রোধে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এখন থেকে আমদানিকারকদের ঘোষিত পণ্যমূল্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন মূল্য-তথ্যভান্ডার ও বাজার সূচকের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ উদ্যোগ একদিকে যেমন আন্ডার-ইনভয়েসিং ও ওভার-ইনভয়েসিংয়ের মতো অনিয়ম কমাবে, অন্যদিকে বৈধ ব্যবসার ক্ষেত্রে হয়রানি ও অপ্রয়োজনীয় জটিলতাও হ্রাস করবে।
গত ১১ জুন জারি করা এক সাধারণ আদেশের মাধ্যমে নতুন এ মূল্যায়ন কাঠামো কার্যকর করেছে এনবিআর। আদেশে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বীকৃত ও নিরপেক্ষ বিভিন্ন মূল্য-প্রতিবেদন সংস্থা, পণ্য এক্সচেঞ্জ এবং বাজার বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্মের তথ্য ব্যবহার করে আমদানি পণ্যের মূল্য যাচাই করা হবে।
এ লক্ষ্যে কাস্টমস কর্মকর্তারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মূল্যতথ্য ব্যবহার করবেন। এর মধ্যে রয়েছে পণ্য ও জ্বালানি বাজার বিশ্লেষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা, ধাতুবাজারের বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম, কমোডিটি ইন্টেলিজেন্স সেবা, আন্তর্জাতিক চিনি বাজার সংস্থা এবং বিশ্ববিখ্যাত আর্থিক তথ্যপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যসংক্রান্ত তথ্যভান্ডার।
নতুন নীতিমালার আওতায় কোনো আমদানিকারক যে মূল্য ঘোষণা করবেন, তা যদি আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং ঘোষিত মূল্যের বিপরীতে সন্দেহ বা ভিন্ন কোনো প্রমাণ না থাকে, তাহলে সেটিকেই লেনদেনমূল্য হিসেবে গ্রহণ করা হবে। ফলে অযৌক্তিকভাবে মূল্য বাড়িয়ে বা কমিয়ে শুল্ক নির্ধারণের সুযোগ অনেকটাই কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে আসছিলেন যে অনেক ক্ষেত্রে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ঘোষিত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্য ধরে শুল্ক নির্ধারণ করে। এতে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং পণ্য খালাসে বিলম্ব ঘটে। নতুন পদ্ধতি সেই অসঙ্গতি দূর করে একটি নির্দিষ্ট ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে।
অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে কম মূল্য দেখিয়ে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া এবং ওভার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে তুলনা করে মূল্য যাচাইয়ের ফলে এ ধরনের অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হবে।
নতুন নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, আমদানি ঘোষণার আগে সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে ইস্যুকৃত প্রোফর্মা ইনভয়েসের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মূল্যতথ্য বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ অনেক পুরোনো বা অপ্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণ করা যাবে না।
কাস্টমস মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতাও বাড়ানো হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক রেফারেন্স মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ঘোষিত মূল্য প্রত্যাখ্যান করতে চাইলে তাকে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি সহকারী কমিশনারের নিচের কোনো কর্মকর্তা এককভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না।
তবে সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম কাস্টমস মূল্য বিদ্যমান থাকলে তার নিচে মূল্যায়ন করা যাবে না। আবার কোনো আমদানিকারক যদি আন্তর্জাতিক রেফারেন্স মূল্য বা সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মূল্যের চেয়েও বেশি মূল্য ঘোষণা করেন, তাহলে সেই উচ্চমূল্যের ভিত্তিতেই শুল্ক নির্ধারণ করা হবে।
বাণিজ্য খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ বাংলাদেশে কাস্টমস ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক, তথ্যনির্ভর ও ডিজিটাল রূপ দিতে সহায়ক হবে। এতে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত কমবে এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অভিন্নতা আসবে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু হলে পণ্য খালাসের সময় কমবে, ব্যবসার ব্যয় হ্রাস পাবে এবং রাজস্ব আহরণও বাড়বে। একই সঙ্গে বৈধ আমদানিকারকেরা অন্যায্য প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা পাবেন।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বিশ্ব বাণিজ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে কাস্টমস ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা প্রয়োজন। এনবিআরের নতুন এই পদক্ষেপ সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এর মাধ্যমে আমদানি বাণিজ্যে আস্থা বাড়বে, রাজস্ব ফাঁকি কমবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক বিশ্বাসযোগ্যতা আরও শক্তিশালী হবে।

