গত এপ্রিল মাসে দেশে পণ্য আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার। এটি গত বছরের একই মাসের তুলনায় ২১ দশমিক ৪০ শতাংশ বেশি। সাড়ে তিন বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ আমদানি ব্যয়।
ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আমদানি বৃদ্ধির এই ধারা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে। তাদের মতে, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধীরে ধীরে ফিরে আসায় ব্যবসায় আস্থা বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানিতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে ৭ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছিল। এরপর আর কোনো মাসেই আমদানি ৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়নি। বেশিরভাগ মাসে তা ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গত মার্চ মাসে আমদানি ছিল ৫ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার। পরের মাস এপ্রিলেই তা এক লাফে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়ে যায়।
বিদায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই থেকে এপ্রিল) দেশে মোট পণ্য আমদানি হয়েছে ৬১ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। এটি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি।
এই সময়ে বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ। মোট আমদানি দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের বছরে ছিল ২ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার।
শিল্প উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি বেড়েছে ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ। এই খাতে মোট আমদানি হয়েছে ৫৪ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের ৫০ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় বেশি। এসব পণ্য প্লাস্টিক, তৈরি পোশাক, পাট ও হালকা প্রকৌশলসহ বিভিন্ন শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এই খাতে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার, যা ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি।
তবে তৈরি পোশাক শিল্পের প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি কমেছে ৭ দশমিক ২০ শতাংশ। এই খাতে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের বছরে ছিল ১৫ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। ডলার সংকট মোকাবিলায় আগের সরকার আমদানি নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারও একই নীতি অনুসরণ করে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দীর্ঘদিন বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষায় ছিলেন। এখন পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় তারা নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন। এতে নতুন শিল্প স্থাপন ও বিদ্যমান কারখানা সম্প্রসারণের উদ্যোগ বাড়ছে।
এর প্রভাবেই মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাড়ছে বলে মনে করেন সিপিডির একজন জ্যেষ্ঠ গবেষক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, সরকারের নতুন মেয়াদের শুরুতে নীতিগত উদ্যোগ ও বাজেটে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা ব্যবসায় আস্থা ফিরিয়ে আনছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রণোদনা তহবিলও বিনিয়োগে উৎসাহ দিচ্ছে।
তার মতে, আগামী কয়েক মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে প্রবণতা আরও স্পষ্ট হবে। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে, তাই আমদানি বাড়লেও বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই।
ব্যাংকারদের সংগঠনের সাবেক চেয়ারম্যান ও একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ডলার সংকট কমেছে, রিজার্ভ বাড়ছে এবং ডলারের বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ একটি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।
তবে তিনি মনে করেন, বিনিয়োগ আরও বাড়াতে হলে সুদের হার কমানো জরুরি। বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজও একই মত দিয়ে বলেন, উচ্চ সুদের কারণে শিল্প স্থাপন ও সম্প্রসারণ লাভজনক হয় না, তাই সুদের হার কমাতে হবে।

