বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে ভারতে রপ্তানি হওয়া পাটপণ্যের ওপর আরোপিত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আপাতত প্রত্যাহারের পক্ষে নয় ভারত। দেশটি এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই শুল্ক বহাল রাখা অথবা প্রয়োজনে সংশোধন করা হতে পারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে ভারতে পাটপণ্য রপ্তানির ওপর আরোপিত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কের মধ্যবর্তী পর্যালোচনা করেছে ভারতের বাণিজ্য প্রতিকার মহাপরিদপ্তর। ১৭ জুন প্রকাশিত ৮৮ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দিলেও তদন্তকারী সংস্থা তাদের প্রাথমিক অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে পাটপণ্য রপ্তানিতে এখনো কম দামে বিক্রির প্রবণতা বা ডাম্পিং অব্যাহত আছে। স্বাভাবিক মূল্যের তুলনায় কম দামে এসব পণ্য ভারতে বিক্রি হওয়ায় দেশটির অভ্যন্তরীণ শিল্পে চাপ তৈরি হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মধ্যবর্তী পর্যালোচনায় ভারতীয় পাটশিল্পের ক্ষতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, স্থানীয় উৎপাদকদের বাজার অংশীদারত্ব কমেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানির অংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে মুনাফা ও নগদ মুনাফা কমেছে, বেড়েছে মজুত। এতে প্রতিযোগিতায় ভারতীয় উৎপাদকরা আরও চাপের মুখে পড়েছেন। বাংলাদেশের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতাকে ঝুঁকি হিসেবে দেখছে ভারত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পাটকলগুলোর বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৬ লাখ ৩৬ হাজার টন হলেও প্রকৃত উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৬৯ হাজার টন। ফলে প্রায় ২ লাখ ৬৭ হাজার টন সক্ষমতা অব্যবহৃত রয়েছে।
ভারতের আশঙ্কা, এই অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে ভবিষ্যতে ভারতে বাংলাদেশি পাটপণ্যের রপ্তানি চাপ আরও বাড়তে পারে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শুল্ক তুলে দিলে কম দামে আরও বেশি পাটপণ্য প্রবেশ করতে পারে। এতে ভারতীয় উৎপাদকরা দাম কমাতে বাধ্য হবেন এবং আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়বে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, তিনি এখনো প্রতিবেদন সম্পর্কে অবহিত নন। তবে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, দুই দেশের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত ভারত সরকার নেবে না। এমন সিদ্ধান্ত হলে তা থেকে সরে আসার আহ্বান জানানো হবে। তিনি আরও বলেন, যদি ভারত এই নীতিতে অনড় থাকে, তবে অন্য বাজারেও রপ্তানির সুযোগ খুঁজবে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সরকারি ভর্তুকির বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার মতে, পাট খাতে দেওয়া নগদ সহায়তা বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রেখেছে।
বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাপস প্রামাণিক বলেন, বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক। তার মতে, প্রায় ৯ বছর ধরে ভারত এই শুল্ক আরোপ করে রেখেছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকারের উচিত বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় ফোরামে তোলা।
তিনি আরও বলেন, ভারতের অভিযোগ অমূলক। বাংলাদেশের পাটপণ্যে ভর্তুকি অনেকটাই কমে গেছে। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি বাংলাদেশের বেশি। শুল্ক না থাকলে রপ্তানি আরও বাড়ত, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ভারতের পক্ষ থেকে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বাংলাদেশ সরকার, বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন এবং সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকেরা ২৪ জুন পর্যন্ত মতামত দিতে পারবেন। সেই মতামতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে বর্তমান প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুল্ক বহাল থাকার সম্ভাবনাই বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০১৭ সাল থেকে এই শুল্ক চলছে। ওই সময় ভারতীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রথম অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করা হয়। প্রতি টন পাটপণ্যে ১৯ থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে এই শুল্কের মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানো হয়। নতুন ঘোষণায় ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া পাটপণ্যে বিভিন্ন হারে শুল্ক বহাল রাখা হয়। ওই সময় প্রতি টনে ৬ থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। ২০২৭ সালের আগেই এবার মধ্যবর্তী পর্যালোচনা করা হলো।
রপ্তানি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া পাটপণ্যের প্রায় ৬০ শতাংশ যায় ভারতে। ২০১৭ সালে শুল্ক আরোপের পর থেকে রপ্তানি কমতে শুরু করেছে।

