বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি খাত পাটশিল্প আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি হওয়া বিভিন্ন পাটপণ্যের ওপর আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বহাল রাখার পাশাপাশি তা আরও কঠোর করার সুপারিশ করেছে ভারতের বাণিজ্যিক তদন্ত সংস্থা। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পাটপণ্যের প্রতিযোগিতা আরও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি ভারতের বাণিজ্য প্রতিকার বিষয়ক মহাপরিদপ্তর মধ্যবর্তী পর্যালোচনার ফলাফল প্রকাশ করেছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশের কিছু রপ্তানিকারক ভারতীয় বাজারে স্বাভাবিক মূল্যের চেয়ে কম দামে পাটপণ্য বিক্রি করছে, যা দেশটির স্থানীয় শিল্পের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই বিদ্যমান অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক অব্যাহত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
ভারত কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি হওয়া পাট সুতা, হেসিয়ান কাপড় এবং পাটের বস্তার ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে। পরে এই তালিকায় আরও কিছু পাটজাত পণ্য যুক্ত করা হয়। এর ফলে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পাটপণ্যের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
একসময় বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের অন্যতম বৃহৎ গন্তব্য ছিল ভারত। ভৌগোলিক সুবিধা, কম পরিবহন ব্যয় এবং বৃহৎ বাজারের কারণে দেশটি বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু শুল্ক আরোপের পর সেই সুবিধা অনেকটাই কমে গেছে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের পাটপণ্যের রপ্তানি প্রায় ১৮ শতাংশ কমে ১ লাখ ১৭ হাজার টনে নেমে এসেছে। আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার টন। যদিও আমদানির পরিমাণ কমেছে, তবুও ভারতীয় সংস্থার দাবি—দেশীয় চাহিদা ২০ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি মাত্র ১৩ শতাংশ কমেছে। ফলে স্থানীয় শিল্পের বাজার অংশীদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তারা মনে করছে।
পর্যালোচনা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের মধ্যে ডাম্পিং মার্জিন ৫ শতাংশ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অর্থাৎ কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে রপ্তানি মূল্য ও স্বাভাবিক বাজারমূল্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের পাটশিল্প সংশ্লিষ্টরা এ অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় ভারতের তুলনায় কম নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি। এছাড়া রপ্তানিতে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়, তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রচলিত নিয়মের মধ্যেই রয়েছে এবং এর পরিমাণও খুব সীমিত।
বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, পাট সুতা রপ্তানিতে মাত্র ৩ শতাংশ এবং হেসিয়ান পণ্যে ৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হয়। এই সামান্য সহায়তাকে ডাম্পিংয়ের কারণ হিসেবে দেখানো বাস্তবসম্মত নয়। তাদের অভিযোগ, ভারত দীর্ঘদিন ধরেই নিজস্ব শিল্পকে সুরক্ষা দিতে বাংলাদেশি পাটপণ্যের ওপর বিভিন্ন ধরনের অশুল্ক ও শুল্ক বাধা সৃষ্টি করে আসছে।
অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই পর্যালোচনার ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভারত ভবিষ্যতে আরও বেশি শুল্ক আরোপের পথেও হাঁটতে পারে। যদিও রপ্তানি কমেছে, তবুও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ স্থানীয় শিল্পের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে বিষয়টি কেবল বাণিজ্যিক নয়, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের পাটশিল্প দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। লক্ষাধিক কৃষক ও শ্রমিক এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ভারতের বাজারে নতুন কোনো বাধা সৃষ্টি হলে তার প্রভাব শুধু রপ্তানিকারকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো পাটভিত্তিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ভারতীয় বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও পূর্ব এশিয়ার নতুন বাজারে পাটপণ্যের উপস্থিতি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে বাংলাদেশের সোনালি আঁশ খাত আগামী দিনে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।

