বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাক খাত। দেশের মোট রফতানি আয়ের বড় অংশই আসে এই শিল্প থেকে। আর সেই খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তবে চলতি বছরের প্রথম চার মাসের পরিসংখ্যান দেশের পোশাক খাতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। শুধু রফতানি আয় নয়, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্বও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। প্রধান পোশাক রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাজার অংশ হারিয়েছে বাংলাদেশ।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও দুর্বল ভোক্তা চাহিদার প্রভাব প্রায় সব রফতানিকারক দেশই অনুভব করছে। তবে বাংলাদেশের রফতানি হ্রাসের মাত্রা প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশি হওয়ায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ইউরো। এক বছর আগে একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ইউরো অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রফতানি আয় কমেছে প্রায় ১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ইউরো।
একই সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি কমেছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। ফলে বোঝা যায়, বাজার সংকুচিত হলেও বাংলাদেশের রফতানি কমেছে তার প্রায় দ্বিগুণ হারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজার অংশীদারত্বে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ছিল ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি বছরের একই সময়ে তা নেমে এসেছে ২১ দশমিক ৯ শতাংশে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে বাংলাদেশ প্রায় আড়াই শতাংশ পয়েন্ট বাজার হারিয়েছে।
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দেশটির পোশাক রফতানি কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
এই সময়ে চীনের রফতানি ৮ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ইউরো থেকে কমে ৭ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। ইইউর সামগ্রিক আমদানি যেখানে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে, সেখানে চীনের পতন তার অনেক নিচে থাকায় দেশটির বাজার অংশীদারত্ব ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৮ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে ইউরোপের বাজারে চীনের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবধানও বেড়েছে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দুটি প্রধান ভিত্তি হলো নিটওয়্যার ও ওভেন পোশাক। কিন্তু চলতি বছরের প্রথম চার মাসে উভয় খাতই বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। নিটওয়্যার রফতানি ২০ দশমিক ১ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ইউরো থেকে ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে ওভেন পোশাক রফতানি কমেছে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। এই খাতে রফতানি ৩ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ইউরো থেকে কমে ২ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, সমস্যা কোনো একটি নির্দিষ্ট পণ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুরো পোশাক খাতই ইউরোপীয় বাজারে চাপের মুখে রয়েছে।
বছরের শুরু থেকেই রফতানি পরিস্থিতি নেতিবাচক ছিল। জানুয়ারিতে রফতানি কমেছে ২৫ শতাংশের বেশি। ফেব্রুয়ারিতে পতনের হার কিছুটা কমে ১২ দশমিক ৫ শতাংশে এলেও মার্চ ও এপ্রিলে আবার পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। মার্চে রফতানি কমেছে ১৯ দশমিক ২ শতাংশ এবং এপ্রিলে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ।
সাধারণত বছরের প্রথম দিকে ইউরোপের খুচরা বিক্রেতারা বসন্ত ও গ্রীষ্মকালীন মৌসুমের জন্য বড় আকারের অর্ডার দিয়ে থাকে। কিন্তু সেই সময়েও বাংলাদেশ প্রত্যাশিত পরিমাণ অর্ডার আকর্ষণ করতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু চাহিদা সংকটের ইঙ্গিত নয়; বরং ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকেও ঝুঁকছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রফতানি আয়ের পতনের পেছনে শুধু অর্ডার কমে যাওয়াই নয়, গড় রফতানি মূল্য হ্রাসও বড় ভূমিকা রেখেছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে বাংলাদেশের রফতানি আয় কমেছে ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে রফতানি পরিমাণ কমেছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
অর্থাৎ বাংলাদেশ একদিকে কম পরিমাণ পণ্য বিক্রি করেছে, অন্যদিকে আগের তুলনায় কম দামেও পণ্য রফতানি করতে হয়েছে। মার্চ ২০২৫ ও মার্চ ২০২৬-এর তুলনামূলক তথ্যেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ওই সময়ে রফতানি মূল্য ১৯ দশমিক ২৪ শতাংশ কমলেও রফতানির পরিমাণ কমেছে মাত্র ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ। বিপরীতে ইউনিট মূল্য কমেছে ১৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, বাজার ধরে রাখতে অনেক ক্ষেত্রে রফতানিকারকদের মূল্যছাড় দিতে হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার, যুদ্ধ পরিস্থিতি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, এলডিসি উত্তরণসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং বন্দরের অদক্ষতা রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শিল্প মালিকদের অভিযোগ, ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে। পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব এবং বন্দর ব্যবস্থাপনায় জটিলতা সময়মতো পণ্য সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ইউরোপীয় বাজারে রফতানি কমার পেছনে অর্ডার হ্রাসের পাশাপাশি ইউনিট মূল্য কমে যাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তার মতে, বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল থাকলেও উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বন্দর ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্যের পণ্যে মনোযোগ বাড়াতে পারলে হারানো বাজার পুনরুদ্ধারের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ যখন বড় ধরনের পতনের মুখে, তখন ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থান ধরে রেখেছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দেশটির রফতানি কমেছে মাত্র ০ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে নিটওয়্যার রফতানি বেড়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
এর ফলে ইউরোপীয় বাজারে ভিয়েতনামের অংশীদারত্ব ৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, পণ্যের বৈচিত্র্য, উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্য উৎপাদন এবং দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা ভিয়েতনামকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।
প্রথম চার মাসে পাকিস্তানের পোশাক রফতানি কমেছে ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ। বিশেষ করে নিটওয়্যার খাতে দেশটির পতন ২২ দশমিক ১ শতাংশ। তুরস্কের রফতানি কমেছে ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। ইউরোপের কাছাকাছি অবস্থান ও দ্রুত সরবরাহ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও দেশটি বাজার ধরে রাখতে পারেনি। অন্যদিকে ভারতের রফতানি কমেছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ, যা ইইউর সামগ্রিক আমদানি হ্রাসের কাছাকাছি। ফলে ভারত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। ২০২৯ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় বাজারে বর্তমানে পাওয়া শুল্কমুক্ত সুবিধা আর থাকবে না। তখন প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। তাদের মতে, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বন্দর সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উচ্চমূল্যের পণ্যে বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগ এখনই জোরদার না হলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—বিশ্ববাজারে চাহিদা কমলেও সব দেশ সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কেউ বাজার হারিয়েছে, আবার কেউ সংকটের মধ্যেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রফতানি আয়, বাজার অংশীদারত্ব এবং গড় ইউনিট মূল্য—তিন ক্ষেত্রেই পতন দেখা গেছে। ফলে এটি শুধু বৈশ্বিক মন্দার প্রভাব নয়, বরং দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতারও একটি বড় পরীক্ষা।
ইউরোপীয় বাজারে পোশাক রফতানির সাম্প্রতিক এই পতন তাই কেবল কয়েক মাসের বাণিজ্য পরিসংখ্যান নয়; বরং দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এখন দেখার বিষয়, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে পারে কি না।

