ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতই দেশের শিল্প কাঠামোর মূল ভিত্তি। দেশের মোট শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯২ শতাংশই এই খাতের অন্তর্ভুক্ত। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাতের অবদান প্রায় ২৫ শতাংশ হলেও রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা কাজে লাগাতে না পারায় পিছিয়ে আছে এসএমই খাত।
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে ১০৭টি এসএমই প্রতিষ্ঠানের ওপর করা জরিপের ফল তুলে ধরা হয়। সেখানে দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া একটিও প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা ব্যবহার করতে পারছে না। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, রপ্তানিকারক ও অ-রপ্তানিকারক এসএমই প্রতিষ্ঠানের শ্রম উৎপাদনশীলতায় তেমন কোনো পার্থক্য নেই। অর্থাৎ সক্ষমতার ঘাটতি নয়, বরং কাঠামোগত বাধাই বড় সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৮৫ শতাংশ উদ্যোক্তা প্রশাসনিক জটিলতাকে রপ্তানির প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ৬৫ শতাংশ জানিয়েছেন অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা বড় সমস্যা, আর ৬৪ শতাংশ কাঁচামালের ওপর উচ্চ শুল্ককে অন্যতম বাধা হিসেবে দেখেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করা হলেও জটিলতা কমেনি। বরং ২০২৪ সালের নতুন বিধিমালায় শর্ত আরও কঠিন হয়েছে। গবেষকরা একে পুরোনো আমলাতান্ত্রিক বিধিনিষেধের ডিজিটাল রূপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এসএমই উদ্যোক্তারা কাঁচামাল আমদানিতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। সরাসরি আমদানির সুযোগ না থাকায় কাঁচামালের ওপর প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্কের বোঝা তৈরি হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, হোম টেক্সটাইল খাতে সুতা আমদানির শুল্ক অনেক সময় উদ্যোক্তাদের বার্ষিক নিট মুনাফার চেয়েও বেশি হয়ে যায়।
কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে ভ্যাটের কার্যকর চাপ প্রায় ১৯৫ শতাংশ, যা এই খাতের বিকাশে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। জরিপে আরও দেখা যায়, ৮২ দশমিক ২ শতাংশ উদ্যোক্তা বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্পর্কে জানেন না। অথচ যথাযথ নীতি সহায়তা পেলে ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান রপ্তানিতে আগ্রহী। আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা আইএফসির তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে পোশাকবহির্ভূত খাতে বছরে অতিরিক্ত দেড় বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় সম্ভব।
ভৈরবের জুতা ক্লাস্টারের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে কর্মরত ৪০ শতাংশ নারী শ্রমিকের মাসিক আয় বর্তমানে তিন থেকে চার হাজার টাকা। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এটি ১৬ থেকে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করা সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যা নারী ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে কুমারখালীর মতো শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংযোগ না থাকায় উদ্যোক্তারা কাঠ পুড়িয়ে ডাইং বা রং করার কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে পণ্যের মান কমে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে খাতটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এসএমই খাতে ২৫ শতাংশ ঋণ বিতরণের কথা থাকলেও বাস্তবে তা ১৮ শতাংশেই সীমাবদ্ধ। জামানত ও নথিপত্র জটিলতার কারণে ছোট উদ্যোক্তারা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, কুটির শিল্পের তুলনায় ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো (২৬–১২০ কর্মী) রপ্তানি সক্ষমতায় ১৪ দশমিক এক গুণ এগিয়ে থাকলেও তাদের সংগঠিতভাবে দাবি তোলার মতো শক্তিশালী কোনো সংগঠন নেই।
বিল্ডের প্রতিবেদনে কিছু সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে। এতে আংশিক রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষ লাইসেন্স চালুর কথা বলা হয়েছে, যেখানে ২৫ শতাংশ রপ্তানি বাধ্যতামূলক থাকবে। পাশাপাশি সুতার ওপর শুল্ক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ৩০ দিনের মধ্যে শুল্ক ফেরত (ডিউটি ড্র-ব্যাক) প্রদানের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে প্রথম ধাপে একটি কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার গড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেখানে শেয়ার্ড বন্ডেড ওয়্যারহাউস, মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাব এবং নারী কর্মীদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকবে। পরে চকরিয়া, ভৈরব ও বগুড়াতেও একই মডেল সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন কাঠামো সংশোধন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে এসএমই ঋণের জন্য বিশেষ ক্রেডিট স্কোরিং ও ঋণ নিশ্চয়তা স্কিম চালুর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, নীতিগত বাধা দূর করা গেলে এসএমই খাত শুধু দেশের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

