২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আয়কর কাঠামো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য তুলনামূলক বেশি চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, নতুন করব্যবস্থায় কম আয়ের করদাতাদের করের বোঝা যেভাবে বাড়ছে, উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সেই বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এতে করব্যবস্থায় বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
রোববার রাজধানীর গুলশানে এক বাজেট-পর্যালোচনা সংলাপে সিপিডি এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে। অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
সিপিডির বিশ্লেষণে বলা হয়, যাদের বার্ষিক করযোগ্য আয় ৬ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকার মধ্যে, নতুন করকাঠামো কার্যকর হলে তাদের করদায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অন্যদিকে বছরে ৩০ লাখ টাকার বেশি আয় করেন এমন ব্যক্তিদের করদায় বৃদ্ধির হার প্রায় ৭ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। ফলে করভার বণ্টনের ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংলাপে ফাহমিদা খাতুন বলেন, একটি ন্যায়সঙ্গত করব্যবস্থায় উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি করের দায় থাকা উচিত। কিন্তু বর্তমান প্রস্তাবিত কাঠামোতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের ওপর চাপ বেশি পড়ছে, যা সামাজিক ন্যায়বিচার এবং করনীতির মূল দর্শনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাজেটে কর্মসংস্থান প্রসঙ্গেও প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি। সংস্থাটির মতে, সরকার আগামী ১৮ মাসে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেটীয় ও নীতিগত প্রতিফলন প্রস্তাবিত বাজেটে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না।
সিপিডির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, শ্রম, প্রবাসী কল্যাণ, শিল্প ও বাণিজ্য—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ মোট বাজেটের তুলনায় হয় স্থির রয়েছে, নয়তো কমেছে। অথচ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে এসব মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
এছাড়া কর্মসংস্থানমুখী বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়ন জটিলতায় আটকে রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। এসব প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
সিপিডি মনে করে, জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত কর্মসংস্থান কৌশল ছাড়া বড় ধরনের চাকরি সৃষ্টির লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা না থাকলে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে গবেষণা সংস্থাটি। বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি সেই লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে তারা। বিদায়ী অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা আনা এবং কার্যকর মুদ্রানীতি অনুসরণ করতে হবে। অন্যথায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।
তবে বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতসহ মানবসম্পদ উন্নয়নে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সিপিডি। সংস্থাটির মতে, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। তবে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সঠিক ও দক্ষ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সংলাপে উপস্থিত অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং নীতিনির্ধারকেরাও বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত দেন। আলোচনায় সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং করব্যবস্থার সংস্কারকে আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বাজেট অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য সামনে রেখে প্রণয়ন করা হলেও করনীতি, কর্মসংস্থান এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

