২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি কমেছে। মে মাসে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও পুরো সময়ের হিসাব বলছে, এই বাজারে সামগ্রিক চাহিদা হ্রাসের প্রবণতা স্পষ্ট।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ৬৪০ মিলিয়ন ডলার কম।
এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের রফতানি ভালো অবস্থানে ছিল। ওই বছর রফতানি ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১৯ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। তবে শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি মূলত দাম বৃদ্ধির কারণে হয়েছে, ক্রয়াদেশের পরিমাণ বাড়ার কারণে নয়।
মাসভিত্তিক চিত্রেও ওঠানামা দেখা গেছে। এপ্রিল মাসে রফতানি ছিল ১ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারে, যা ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। জানুয়ারির ১ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারের পর এটি চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাসিক আয়।
তবে বছরের বড় অংশজুড়ে রফতানি ছিল নিম্নমুখী। জুলাইয়ের ১ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার থেকে সেপ্টেম্বর মাসে তা কমে ১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। পরে ফেব্রুয়ারি ও মার্চে আবারও কমে যথাক্রমে ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ও ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, বছরের শুরুতে রফতানিতে বড় পতন দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত মিলছে। তিনি বলেন, “সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইইউ বাজারে কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। চাহিদা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে বছরের বাকি সময়েও এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।”
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার জার্মানি। এপ্রিল মাসে দেশটিতে রফতানি ছিল ৩১৬ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার, যা মে মাসে বেড়ে ৪০৯ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। তবে এই পরিমাণ এখনো জুলাই মাসের সর্বোচ্চ ৪৭১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারের নিচে। এতে বোঝা যায়, বাজারের চাহিদা এখনো আগের অবস্থায় ফেরেনি।
মে মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানির প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ গেছে জার্মানিতে। স্পেন দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার হিসেবে রয়েছে। মে মাসে দেশটিতে রফতানি হয়েছে ৩০০ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার, যা এপ্রিলের ২৮৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় কিছুটা বেশি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য বাজারেও চিত্র মিশ্র। ফ্রান্সে এপ্রিলের ১৭৩ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার থেকে মে মাসে রফতানি বেড়ে ১৯০ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। ইতালিতে কয়েক মাস কমতির পর রফতানি বেড়ে ১৩৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। নেদারল্যান্ডসে রফতানি ছিল ২১০ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার এবং পোল্যান্ডে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৭ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার।
নর্ডিক অঞ্চলে সুইডেন মাসভিত্তিক সর্বোচ্চ আমদানিকারক হিসেবে ৯৪ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। ডেনমার্কে রফতানি বেড়ে ৮২ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বেলজিয়ামে রফতানি স্থিতিশীল ছিল ৫১ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার। অস্ট্রিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের মতো ছোট বাজারগুলোতেও কিছু প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরো খাত দীর্ঘ সময় ধরেই চাপের মধ্যে রয়েছে। একজন শিল্প প্রতিনিধি রকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, গত বছরের বেশিরভাগ সময়ই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল, মাঝেমধ্যে স্বল্প সময়ের জন্য কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে।
তিনি বলেন, “গত ১০ মাসের বেশিরভাগ সময় আমরা নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মধ্যেই ছিলাম। কিছু সময় উন্নতি দেখা গেছে, তবে সামগ্রিক ধারা এখনো নেতিবাচক।” তার মতে, বৈশ্বিক সংঘাত, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি এবং উচ্চ দামের কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এতে বিক্রি ও ক্রয়াদেশ দুই-ই কমেছে।
অন্য এক শিল্প প্রতিনিধি তাইমুর রহমান বলেন, বৈশ্বিক সোর্সিং ব্যবস্থার পরিবর্তনে ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা অনেক বেড়েছে। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ায় অনেক সরবরাহকারী ইউরোপে ঝুঁকছে। এতে প্রতিযোগিতা ও দামের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কাস্টমস ও বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থার জটিলতার কারণে অনেক সময় নতুন ধরনের পণ্য সরবরাহে বাধা তৈরি হচ্ছে।
মে মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের মোট রফতানি ছিল ১ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৯২ শতাংশই তৈরি পোশাক। বাজার বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টা থাকলেও এখনো ইউরোপীয় বাজারের ওপর পোশাক খাতের বড় নির্ভরতা স্পষ্ট। মে মাসে রফতানি কিছুটা বাড়লেও শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, ধারাবাহিক পুনরুদ্ধারের কথা বলার সময় এখনো আসেনি।

