দেশের প্রাথমিক টেক্সটাইল শিল্পে সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। গত সাত বছরে ২৩৪টি টেক্সটাইল মিল উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে, যার মধ্যে ১১৪টিই স্পিনিং মিল। একই সময়ে দেশীয় উৎপাদন কমলেও বিদেশ থেকে সুতা আমদানি দ্রুত বেড়েছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের টেক্সটাইল খাত আরও বড় চাপে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের ওপর।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পর্যালোচনা উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) এসব তথ্য তুলে ধরে। সংগঠনটির নেতারা বলেন, করনীতি, শুল্ক কাঠামো এবং কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান কিছু নীতিগত জটিলতা শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে অনেক কারখানা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রমই বন্ধ করে দিয়েছে।
বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অনেক টেক্সটাইল কারখানা তাদের সক্ষমতার মাত্র ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যবহার করে উৎপাদন করছে। অন্যদিকে সুতা আমদানির পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে সুতা আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়। একই সময়ে ভারত থেকে সুতা আমদানিও দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, গ্যাস ও বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য, ব্যাংকঋণের বাড়তি সুদ, রপ্তানি সহায়তা কমে যাওয়া এবং কাঁচামালের মূল্য অস্থিরতার কারণে দেশীয় টেক্সটাইল শিল্প দীর্ঘদিন ধরেই চাপের মুখে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শুল্ক সুবিধায় আমদানিকৃত বিদেশি সুতা, যা স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করছে।
বিটিএমএর মতে, ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত তুলে দেওয়া হলে বাজারে অনিয়ম ও অপব্যবহার আরও বাড়তে পারে। এতে দেশীয় শিল্পের ক্ষতি হবে এবং স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের গুরুত্ব আরও বাড়বে।
সংগঠনটির নেতারা বলেন, বর্তমানে প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতে কার্যকর করহার প্রায় ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ, অথচ একই রপ্তানি মূল্যশৃঙ্খলের অংশ তৈরি পোশাক খাতে করহার ১২ শতাংশ। এই বৈষম্য শিল্পের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। তাই টেক্সটাইল খাতের করপোরেট করহার ১২ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে।
তারা আরও উল্লেখ করেন, বিশ্ব পোশাক বাজারের বড় অংশ এখন কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক বা ম্যান-মেড ফাইবার নির্ভর। কিন্তু বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও প্রধানত তুলাভিত্তিক পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। এমন পরিস্থিতিতে পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবারের ওপর নতুন করে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
বিটিএমএর হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রাথমিক টেক্সটাইল শিল্পে সরাসরি প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা প্রায় এক কোটি। ফলে শিল্পের বর্তমান সংকট কেবল উদ্যোক্তাদের সমস্যা নয়; এটি কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাত, রপ্তানি আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
শিল্প নেতাদের মতে, দেশীয় টেক্সটাইল শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এখনই কার্যকর নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। অন্যথায় মিল বন্ধের ধারা আরও ত্বরান্বিত হবে, আমদানিনির্ভরতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের রপ্তানি খাতের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় টেক্সটাইল খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

